Camp Inani তে স্বাগতম।
না। এটা কোন রিসোর্ট না। হোটেল বা মোটেল না।
এটা হলো ইনানী ভ্যালি’র দোরগোড়ায় ছোট্ট একটা কাঠের কেবিন (Kornel’s Cabin ) যেখানে একটি পরিবার দু একদিন নিরিবিলি পরিবেশে রাত কাটাতে পারে। দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা এবং এক্সপার্টদের পরামর্শে এবং নিতান্তই শখের বশে বানানো যেখানে বানিজ্যিক ভাবনা বাতুলতা। যারা কক্সবাজারে গিয়ে সুইমিং পুল অথবা ক্যাশুনাট স্যালাড খুজেন তাঁরা এই আমন্ত্রন কে খুব স
িরিয়াস ভাবে নেবেন না।
অনেক টাকা ব্যয় ক’রে এবং দীর্ঘ রাস্তা পাড়ি দিয়ে কক্সবাজারে গিয়ে আপনি শুধু সমুদ্র সৈকত দেখেন যা দ্বিতীয় দিনেই পানসে হয়ে যায়। আবার সাগরের ঢেউ গোনা আপনার কাছে খুব রোমান্টিক মনে হলেও উঠতি সন্তানদের কাছে তা খুব বোরিং একটা ইস্যু। সব কিছু মিলিয়ে ছুটিটা কেমন যেন জমে না।সেই সাথে চড়াদাম, ধুলাবালি আর গাড়ি ঘোড়ার প্যাঁপু তো আছেই।
তো ছুটির সময়টাকে অর্থবহ করার জন্য চলে আসুন Camp Inani তে।
কেন Camp Inani ?
শুরুতেই বলেছি এটা আপনার পরিবারকে বা ছোট দল কে একটা কোয়ালিটি কিন্তু রোমাঞ্চকর টাইম দেবে।ধরুন আপনি দু দিনের জন্য এলেন। তো কি করা যায় ?
১। এলাকাটা মুলত একপাল হাতির বিচরন ক্ষেত্র। ৯-১২ টি বিভিন্ন বয়সী হাতি খাবারের খোঁজে বান্দরবন-আলিকদম-রামু হয়ে এই এলাকায় আসে। এমন একটা জায়গায় রাত্রিযাপন কিছুটা ভয়ের। কিন্তু অবাক ব্যপার হলো অনেক মানুষ আসে এই “ভয়” এর খোঁজে। তবে নিশ্চিত থাকুন। Kornel’s Cabin ঘিরে আছে অনেক গুলো স্থানীয়দের বসতবাড়ি এবং নিকট অতীতে হাতির পাল ইনানী খাল ক্রস ক’রে ত্রিসীমানায় পা দেয় নাই। আর আর্লি ওয়ার্নিং হিসাবে “বাগবাই” তো আছেই।
২। যেদিন এলেন সেদিন ক্যাম্প সেট আপ আর ওরিয়েন্টেশন। তারপর দুপুরের আগেই চলে গেলেন ইনানী বীচে। ঘন্টা দু তিনেক কাটিয়ে ক্যাম্পে ফিরেই আপনার জন্য থাকবে আপনার দেয়া মেনু অনুযায়ী ফ্রেশ লাঞ্চ। তারপর “সিয়েস্তা”। ছোট্ট একটা ঘুম।
৩। বিকালে চলে গেলেন ফান-ফেস্ট প্যারা সেইলিং করতে। আপনার পরিবারের দস্যি ছেলে বা মেয়ে তা খুব পছন্দ করবে। সন্ধ্যার পরই ক্যাম্পে ব্যাক। গান শুনুন বা মুভি দেখুন।
৪। অথবা বিকালে বের হোন মাউন্ট সাগুনী সংলগ্ন “সেরেংগেটি ট্রেইল” এ। চড়াই উৎরাই বেয়ে ওঠানামা করতে আপনার যথেষ্ঠ ফিজিক্যাল ফিটনেস থাকতে হবে। পারবেন না পারবেন না বললেও ঠিকই শেষ করবেন। ২ ঘন্টার এই ট্রেইলের শেষ পর্ব টা আপনার ভালো লাগবে। নামিরা রানা কিন্তু তাই বলেছে।
৫। ২য় দিন শুরুতেই ভরপেট খিচুড়ী খেয়ে তৈরী হয়ে নিন । প্রায় তিন ঘন্টার “পাতাগোনিয়া ট্রেইল” ট্র্যাকিং করার জন্য। চড়াই উৎরাই শেষে হাটু পানিরে স্বচ্ছ ইনানী খাল আপনাকে দারুন প্রশান্তি দেবে। সেই সাথে হাতির পালের ভয় আপনাকে সর্বক্ষন তাড়িয়ে বেড়াবে।
৬। ফিরে এসে দুপুরের লাঞ্চ করলেন। “সু-শি-শা” শেষে বিকালে গেলেন মেরিন ড্রাইভ দিয়ে দক্ষিনে পাটুয়ারটেক বা তারপরের কোন দিকে যেতে পারেন।
৭। আসার পথে রয়েল টিউলিপ বা পছন্দের কোন রেস্তোরা থেকে চা নাস্তা খেয়ে আসলেন। অথবা ডিনার টা সারলেন পছন্দের কোন নিরিবিলি রেস্তোরায়। পরিবার নিয়ে ক্যাম্পেই বার বি কিউ করতে চাইলে তারও সুব্যবস্থা আছে।
৮। পরদিন ভোরটা কাটালেন “আমাজন ট্রেইল” দিয়ে খালি পায়ে হেটে। সকালে ক্যাম্পেই নাস্তা করলেন। তারপর বাঁধাছাঁদা করে বিদায়ের পালা।
এখানে থাকার জন্য Kornel’s Cabin আপনাকে কিছুটা বৈচিত্র্য এনে দেবে আশা করি। এর ভালো দিক পড়া শেষে এর মন্দ দিক গুলো পড়তে ভুলবেন না।
১। এটা প্রায় ৪৫০ স্কয়ারফিটের দুই কক্ষ বিশিষ্ঠ একটা কাঠের কেবিন যেখানে ৪ জনের একটা পরিবার বা ৪-৫ জনের একটা দল হেসে খেলে থাকতে পারবে।
২। বাথরুমটা আধুনিক সুবিধা দিয়ে বানানো (তবে সাউন্ডপ্রুফ নয়)
৩। বাতাস চলাচলের জন্য “ক্যালিফোর্নিয়া শাটারস” দেয়া আছে। দুপুরের দিকে একটু গরম বোধ হলেও সিলিং ফ্যান ছেড়ে মিরর পলিশড টাইলসে গড়াগড়ি দেয়া যাবে।
৪। ৪৩ ইঞ্চি এন্ড্রয়েড টিভি থাকলেও নেটফ্লিক্স বা ডিশ কানেকশন নেই। তবে ৫০০ জিবি’র একটা মুভি কালেকশন আছে যা আপনার দু তিন দিনের খোরাক হতে পারে যদিও ব্যাপারটা আমাদের খুব অপছন্দনীয়।
৫। আমরা চাই আপনি বই বা ম্যাগাজিনের পাতা উল্টান। এজন্য ন্যাশনাল জিওগ্রাফি’র অনেক গুলো ম্যাগাজিন আছে। আশা করি ভালো লাগবে।
৬। স্রেফ বাংলা খাবারের জন্য আধুনিক কিচেন আছে। আগে বলে দিলে কুক বাজার করে এনে রান্না করে দেবে। বুঝতেই পারছেন কত সময় লাগতে পারে। তবে চাইলে নিকটস্থ “লা বেলা” বা রয়েল টিউলিপ থেকে খাবার এনে দেয়া যাবে। শুধু যাতায়াত ভাড়া টা দিয়ে দেবেন।
৭। অনেকটা সময় কাটাতে পারবেন কেবিনের সামনে সবুজ ঘাসে পা মেলিয়ে বসে। সামনের ইনানী খাল (হবু লেক), মাউন্ট সাগুনী এবং ইনানী ভ্যালি আপনার মনে যথেষ্ঠ সতেজতা এনে দেবে।
৮। “বাগবাই” নামে একটা ফ্রেন্ডলি বাচ্চা কুকুর আছে যাকে গার্ড ডগ হিসাবে আনা হলেও একদম তেজহীন।
৯। সিজন ভেদে কাচা আম, তেতুল বা লেবুর শরবত এবং ডাব পাবেন আনলিমিটেড। সেই সাথে দুধ-চা কফি তো আছেই।
১০। ঘরে চারটা বৈয়াম এ সাক্করপড়া, নিমকপড়া, চানাচুর ও চাল্ভাজা থাকবে। চোয়াল ব্যাথা না হওয়া পর্যন্ত খেতে থাকুন।
১১। যারা ক্যাম্পিং এর স্বাদ নিতে চান তারা ৫/১০ জনের তাঁবুতে থাকতে পারেন।
কিছু জিনিস আপনি পাবেন এমনিতেইঃ
১। একজন দক্ষ ক্যামেরাম্যান আপনাকে সার্বক্ষনিক অনুসরণ করবে।তাই সেলফি বা নিজে ছবি তোলার কোন ঝামেলা নেই। দিন শেষে শ’পাচেক ছবি OTG ক্যাবেলের মাঝে আপনার মোবাইল ডিভাইসে চালান করে দেবে। মুগ্ধতা গ্যারান্টেড। ও হ্যা। ক্যামেরাম্যান “কাপ্তান” কিন্তু একজন দক্ষ গাইডও বটে।
২। আপনার জন্য ৭ সীটের একটা “ক্যারাভান” রিজার্ভ থাকবে। বীচে আনা নেয়া বা আশেপাশের এলাকায় ঘুরতে নিয়ে যাওয়ার জন্য সে প্রস্তুত থাকবে। ক্যারাভান পাইলট কে নিরাপত্তাকর্মী হিসাবেও ভাবতে পারেন।
৩। ক্যাম্পের বাংলা খাবার আপনার পছন্দ না হলে নিকটস্থ “লা বেলা”তে খেতে পারেন। আমরা একটা ডিস্কাউন্টের ব্যবস্থাও করতে পারবো।
৪। FUNFest এর ক্ষ্যাপাটে মালিক শিমুল ভাই এর কাছ থেকে বলে কয়ে ডিস্কাউন্ট বা প্রায়োরিটিও এনে দেয়া যেতে পারে।
৫। অন্যান্য রেস্টুরেন্ট এর সাথে কথা হয়নি। তবে আমি নিশ্চিত এরাও একটা ডিস্কাউন্ট দেবে। Kornel’s Cabin এর অতিথি বলে কথা।
৬। ক্যাম্প এলাকার সার্বিক দায়িত্বে আছেন একজন চৌকস সেনাসদস্য। যে কোন জিনিস রাতারাতি পয়দা করতে তাঁর জুড়ি নাই।
কি ভাবে আসবেনঃ
১। Camp Inani কক্সবাজার জেলার উখিয়া উপজেলার ইনানীতে অবস্থিত। গুগলমামা ভেরিফিকেশন এখনো কমপ্লিট করে নাই। তাই La bella গুগল করে আসেন। সেখান থেকে একজন পাইলট ৭-সিটার ক্যারাভানে আপনাকে নিয়ে যাবে। La bella সেনাবাহিনীর বে ওয়াচ রিসর্ট থেকে প্রায় ১ কিমি আগে এবং রয়েল টিউলিপ থেকে প্রায় ৩ কিমি আগে LGED রোডের পাশে অবস্থিত। তাই আপনার অবস্থান কিন্তু মুল ইনানীতে।
২। La bella ইনানী কক্সবাজার ডলফিন পয়েন্ট থেকে প্রায় ৩০ কিমি দক্ষিনে এবং কক্সবাজার এয়ারপোর্ট থেকে প্রায় ৩৫ কিমি দক্ষিনে। সি এন জি তে এলে প্রায় ৫০০-৭০০ টাকা ভাড়া নেবে।
৩। যারা গাড়িতে আসবেন তারা রেজুখাল ব্রীজে সম্ভাব্য জ্যামের কথা বিবেচনায় রাখবেন।গাড়ি পার্কিং এর জন্য আমরা La bellaকে অনুরোধ করবো।
৪। আপনি চাইলে এয়ারপোর্ট বা ডলফিন পয়েন্ট থেকে মাইক্রো বা সিডানে নিয়ে আসার ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
৫। ফেরত যাবার প্ল্যানও করে রাখবেন
Camp Inani এর নেতিবাচক দিকগুলোঃ
১। এটা নিতান্তই শখের বশে বানানো যা শুধু মাত্র বন্ধু বান্ধব বা আত্মীয় স্বজনদের জন্য । তাই ভুল ত্রুটি গুলো নিজের করে ভাববেন।
২। এটা মুল LGED রাস্তা থেকে ৮০০ গজের আঁকাবাঁকা পথের শেষে অবস্থিত। অনেকে এটাকে সমস্যা ভাবলেও আমরা এটাকে আশির্বাদ ভাবি। পাহাড়ের পাদদেশে নদীর ধারে একরকম শব্দহীন জায়গা মেলা ভার।
৩। দুপুরবেলা একটু গরম হয়। এসি লাগানো যায়নি ক্যালিফোর্নিয়া শাটার’স থাকার ফলে।
৪। ইনানী একদম পাথুরে এলাকা যেখানে খাবার পানি ইজ এ বিগ ক্রাইসিস। আমরা ইনানী খালের পানি বিভিন্ন লেয়ারে পরিশোধন করে আনি বলে একটু লবনাক্ত ভাব থাকে। আমরা সরকারী ভাবে গভীর নলকুপ স্থাপনের চেষ্টা করছি। ততদিন লবন পানি দিয়ে গোসল করুন। শরীরের ব্যাথা চলে যাবে।
৫। শুরুতেই বলেছি এটা এলিফ্যান্ট ট্রেইলে অবস্থিত। তাই সবসময় আপনাকে অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।
৬। আশে পাশে কিছু Haunted Place আছে। সাধু সাবধান।
যা করবেনঃ
১। সময় টাকে দারুনভাবে ব্যবহার করুন। ঘরে বসে শুয়ে থাকবেন না। কেবিনের সামনে চেয়ার পেতে বসে গুড়-মুড়ি- লাল চা খান। ভালো লাগবে। আড্ডা জমান।
২। বই নিয়ে যান। বই পড়ুন। চিঠি লিখুন। ফিরে যান ডিজিটাল জগত ছেড়ে ফেলে আসা দিনগুলোতে।
৩। গলা ছেড়ে গান গান। অথবা গান শুনুন।
৪। এক দিস্তা কাগজ নিয়ে আসুন। অসমাপ্ত লেখাটা শেষ করুন। হোক না সেটা গল্প-কবিতা-জলছবি। প্রিয়জনের কাছে চিঠি লিখুন দুকলম। প্রাপক নিশ্চয়ই পছন্দ করবে।
৫। জংগল ট্র্যাকিং করুন। এটা একটু কষ্টসাধ্য হলেও আপনার জীবনে বৈচিত্র্য এনে দেবে। বুনো জংগল, অচেনা পাখীর কলতান আর ইনানী খালের থির থির পানি আপনার মনে দাগ কাটবেই।
৬। ছবি তুলুন শত সহস্র। ক্যাপ্টেন এর হাত খুব ভালো।
৭। ক্যাম্পে রান্নায় অংশ নিন। বার বি কিউ এর আয়োজন নিজে করুন। এসবের টেস্টও হয় অসাধারণ।
৮। ক্যাম্পে বা পাহাড়ে গাছের চারা রোপন করুন। থাক না কিছু স্মৃতি।
৯। Kornel’s Cabin এর জন্য একটা পুরোনো বই উপহার দিন। আমাদের ভালো লাগবে।
যা করবেন নাঃ
১। প্লিজ এ কটা দিন সোশ্যাল মিডিয়াকে বিদায় দিন। সকল অন্তর্জ্বাল থেকে দূরে থাকুন। অযথা ফোন করবেন না বা কথা দীর্ঘায়িত করবেন না।
২। সেলফি তুলবেন না। এটা একটা ভয়ংকর রোগ। আপনার সময়টাকে স্মরনীয় করে রাখার জন্য প্রফেশনাল ফটোগ্রাফার আছে।
৩। কোথাও। আই রিপিট কোথাও পানির বোতল, বিস্কিট বা চিপস এর প্যাকেট ফেলবেন না। আমরা কিন্তু ভীষন রাগ করবো।Kornel কিন্তু খুব বদরাগী
৪। জাংগল ট্র্যাকিং এর সময় কথা বলবেন না। এতে প্রকৃতির নিস্তব্ধতা মিস করবেন। তা ছাড়া আশে পাশে হাতির দলের উপস্থিতি টেরই পাবেন না।
৫। হাতি’র সামনে পড়লে কি করতে হবে তাঁর সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা আছে। এটাকে চ্যালেঞ্জ করতে যাবেন না। অযথা বাহাদুরী বিপদ ডেকে আনতে পারে।
৬। গাইড কে অনুসরণ করুন। অন্য অজানা পথে পা বাড়াবেন না। পাহাড়ে হারিয়ে যাওয়া খুব সহজ।
৭। নিরীহ বন্যপ্রাণীকে বিরক্ত করবেন না।
৮। যে কোন ধরনের মাদকতা বা ধুমপান থেকে বিরত থাকুন।
Camp Inani কোন রিসোর্ট নয়। বরং এটা রহস্য-রোমাঞ্চের দ্বার বিশেষ। দু সপ্তাহ আগে ১০ জন বিভিন্ন বয়সের একটা টিম দিয়ে সকল কার্যক্রমের টেস্ট-রান দেয়া হয়েছে। ফলাফল অসাধারণ।
তো আর দেরী কেনো?
ভ্রমন প্ল্যান করুন। তারপর ছুটি নিন।
আমরা আপনার ফোনের অপেক্ষায় থাকলাম
ইতি
জালাল সাহেব।
01753211211