06/07/2026
স্মৃতির আর্কাইভ থেকে - ০২
ডিভোর্স পেপারটা ড্রয়িংরুমের কাঁচের টেবিলটার ওপর পড়ে আছে। গত তিন দিন ধরে কেউ ওটাতে হাত দেয়নি। রিয়া আর সাজিদের পাঁচ বছরের সংসার শেষ হতে চলেছে মাত্র কয়েকটা স্বাক্ষরের অপেক্ষায়। দুজনের মধ্যে এখন কেবলই এক হিমশীতল নীরবতা, যে নীরবতার আড়ালে লুকিয়ে আছে হাজারো না-বলা অভিযোগ, ক্ষোভ আর ইগোর পাহাড়।
স্বাক্ষর করার ঠিক আগের রাতে সাজিদ হঠাৎ বলল, "কাগজটা সই করার আগে চলো তিন দিনের জন্য কোথাও থেকে ঘুরে আসি। আমাদের সেই শুরুর দিনগুলোর মতো। কোনো প্ল্যান ছাড়া। শুধু তুমি আর আমি। এরপর ফিরে এসে যা হওয়ার হবে।" রিয়া প্রথমে আপত্তি করলেও, ভেতরকার কোনো এক অজানা কারণে শেষমেশ না করতে পারল না।
কক্সবাজারের চেনা কোলাহল আর ভিড়ভাট্টা এড়িয়ে তাদের গাড়ি ছুটল মেরিন ড্রাইভের দিকে। শহরের যান্ত্রিকতা থেকে বহু দূরে, পাহাড় আর সাগরের মাঝখানে এক নিরিবিলি রিসোর্টে যখন তারা পৌঁছাল, তখন বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা। ব্যালকনি থেকে বিশাল সমুদ্র দেখা যায়। ঢেউয়ের একটানা গর্জন ছাড়া আর কোনো কোলাহল নেই সেখানে।
প্রথম দিনটা কাটল অদ্ভুত এক অস্বস্তিতে। দুজন একই রুমে, অথচ যোজন যোজন দূরত্ব। কিন্তু প্রকৃতির এক নিজস্ব নিরাময় ক্ষমতা আছে।
দ্বিতীয় রাতে হঠাৎ শুরু হলো কালবৈশাখী আর তুমুল বৃষ্টি। কারেন্ট চলে যাওয়ায় চারদিক ঘুটঘুটে অন্ধকার। ব্যালকনির ইজিচেয়ারে রিয়া একা বসে সাগরের দিকে তাকিয়ে ছিল। সমুদ্রের উত্তাল গর্জন আর বৃষ্টির ছাঁট এসে তার মুখে লাগছে। হঠাৎ সাজিদ এসে পাশে বসল, হাতে দুই মগ ধোঁয়া ওঠা কফি। কফির মগটা এগিয়ে দিয়ে সাজিদ খুব নিচু স্বরে বলল, "মনে আছে, আমাদের প্রথম অ্যানিভার্সারিতেও ঠিক এমন বৃষ্টি হচ্ছিল?"
ওই একটা কথাই যেন জাদুর মতো কাজ করল। শহরের ধুলোবালি, ক্যারিয়ারের ইঁদুর দৌড়, আর প্রতিদিনের যান্ত্রিকতার চাপে যে মানুষ দুটো একে অপরের দিকে তাকানোর সময় পেত না, তারা আজ সবকিছুর বাইরে গিয়ে শুধু নিজেদের মুখোমুখি। প্রকৃতির এই বিশাল নীরবতার মাঝে কোনো অভিযোগের ভাষা নেই, আজ শুধু জমে থাকা কষ্টগুলো বের হয়ে এলো। রিয়া ডুকরে কেঁদে উঠে বলল, "আমরা তো এমন ছিলাম না সাজিদ! আমরা তো একে অপরের সবটুকু বুঝতাম। তাহলে মাঝখান থেকে এসব কী হয়ে গেল?"
সাজিদ কোনো উত্তর দিল না। শুধু রিয়ার হাতটা শক্ত করে চেপে ধরল। সাগরের বিশালতার সামনে দাঁড়িয়ে মানুষের ইগো বড্ড তুচ্ছ মনে হয়। নিস্তব্ধ প্রকৃতি আর রাতের সেই অবিশ্রান্ত বৃষ্টি তাদের শিখিয়ে দিল—সম্পর্কগুলো আসলে মরে যায় না, শুধু অবহেলা আর ব্যস্ততার ধুলোয় ঢেকে যায়। সেই ধুলো পরিষ্কার করার জন্য মাঝে মাঝে এমন নিভৃত কোনো আশ্রয়ের প্রয়োজন হয়, যেখানে চারপাশের কোনো আওয়াজ নেই, শুধু নিজেদের হৃদস্পন্দন শোনা যায়।
পরদিন সকালে যখন রোদ উঠল, সমুদ্র একদম শান্ত। রিয়া আর সাজিদ পাশাপাশি হেঁটে যাচ্ছে সৈকতের নরম বালুতে। লাল কাঁকড়াদের ছুটে চলা দেখছে দুজন। তাদের দুজনের মুখেই দীর্ঘ এক বছর পর স্নিগ্ধ হাসি।
ঢাকায় ফিরে ডিভোর্স পেপারটা আর সাইন করা হয়নি, সেটা ছিঁড়ে ফেলা হয়েছিল। মেরিন ড্রাইভের সেই শান্ত রিসোর্টটি কেবল তাদের কয়েক রাতের আশ্রয় ছিল না, ছিল মৃতপ্রায় একটি সম্পর্ককে নতুন করে বাঁচিয়ে তোলার এক ম্যাজিক। তারা বুঝতে পেরেছিল, মাঝে মাঝে হারিয়ে যাওয়া সম্পর্কগুলোকে খুঁজে পেতে হলে এমন কোনো ঠিকানায় হারিয়ে যেতে হয়, যেখানে সাগরের ঢেউ আর ঝাউবনের হাওয়া ফিসফিস করে বলে—'সব শেষ হয়ে যাওয়ার আগেও নতুন করে শুরু করা যায়।'