29/07/2023
মাধ্যমিক পরীক্ষায় ক্লাশের যে দুটি ছাত্র ফেল করলো, রেজাল্ট কার্ড দেবার সময় গম্ভীর স্বরে দুজনকেই বললাম, আজ ছুটির পর তোরা বারান্দায় আমার অপেক্ষায় থাকবি। তাদের ভেতর অজানা শঙ্কা জন্ম নিলো। যদিও একজন প্রায় নির্বিকার।
ছুটির ঘন্টা দিলো। সব গুছিয়ে আমি যখন বের হলাম তখন ছোকরা দুটো সিড়িতে গালে হাত দিয়ে বসে আছে আর মাঝে মাঝে ঠাস ঠাস করে মশা মারছে। কাছে ডাকলাম তাদের। বললাম, চল তোরা আমার সাথে। ওরা ভীতমনে আমার পিছু নিলো। কি করবো সেটা হয়তো নিশ্চিত হতে চাইছে। তখন পড়ন্ত বিকেল। মাঠভর্তি সোনালি গমের শিষ দিগন্তজুড়ে ঢেউ তুলছে। মধ্যপথে থেমে তিনটে হাওয়াই মিঠাই কিনলাম। দুজনকে সেধে বললাম, নে তোরা খা। ভয় পাস না, আমি তোদের বাসায় অভিযোগ দেবার জন্য সাথে আসি নাই।
হঠাৎ হঠাৎ লাফিয়ে উঠছে বাদামী ফড়িং। দেখতে পেয়ে আমি একটা ফড়িংয়ের পিছু ছুটতে শুরু করলাম। ছুটতে ছুটতে ছোকরা দুটোকে বললাম, তোরা একটা সুতো খুঁজে বের হর। একেবারে হাল্কা একটা সুতো। ততক্ষণে আমি একটা ফড়িং ধরেছি। সাবধানে নিলাম, যাতে ওর ক্ষতি নাহয়। সুতো নিয়ে ওরা কাছে এলো। আমি বললাম, বেঁধে দে লেজের মধ্যে। সুতোসমেত যখন ঘাস ফড়িংটা ছেড়ে দিলাম তখন সে প্রাণপণে উড়তে শুরু করলো। আমরা তিনজন মিলে ওর পিছু নিলাম। সোনালী গমের মাঠ, পড়ন্ত বিকেলে আমরা তিনজন মাঠের মধ্যে ফড়িংয়ের পেছন পেছন ছুটছি। কাঁচা মাটির পথ। অবশেষে পুনরায় ফড়িংটা ধরে ওরা সুতো খুলে তারপর ছেড়ে দিলাম।
ওদের জিজ্ঞেস করলাম, তোরা কি গান গাইতে পারিস?
ওদের একজন বললো, অপরজন খুব ভালো লালনসঙ্গীত গাইতে পারে। আমরা নদীর পাড়ে নরম ঘাসের উপর বসলাম। ছোট ছোট ডিঙি নৌকায় পারাপার হচ্ছে মানুষ। হাতে, কাঁধে সওদার থলে।
বললাম, গলা ছেড়ে গান ধর। পরম মমতায় সে গাইতে শুরু করলো,
"খাঁচার ভেতর অচিন পাখি
কেমনে আসে যায়।
তারে ধরতে পারলে মন বেড়ি,
দিতাম পাখির পায়ে।
কেমনে আসে যায়,
খাঁচার ভিতর অচিন পাখি কেমনে আসে যায়।"
আমি স্তব্ধ হয়ে শুনছি। কি চমৎকার দরদমাখা গলা অথচ কখনো স্কুলের অনুষ্ঠানাদিতে তাকে গান গাইতে দেখি নি। ততক্ষণে দ্বিতীয়জন উঠে নদীতীরে বনের মধ্যে কি জানি খুঁজতে গেলো। কিছুক্ষণ পর হাতে দুটো আতা গাছের পাতা নিয়ে ফিরে এলো। গানের তালে তালে এক অপার কৌশলে সে পাতা দিয়ে বাঁশির সুর তুললো। কি অসাধারণ শ্রুতিমধুর লাগছে। সে এক অনন্য বৈশিষ্ট্য। আমিও তাদের সাথে কণ্ঠ মেলালাম,
"লালন বলে জাতের কি রুপ
দেখলাম না এই নজরে,
সব লোকে কয় লালন কি জাত সংসারে।"
যে গান গাইলো তাকে জিজ্ঞেস করলাম, তোর বাসায় কে কে আছে রে?
বললো, মা আর ছোট বোন। বাবা মারা গেছে কিছুদিন হইলো। দীর্ঘ সময় অসুখে ভুগে তারপরে মারা গেলো। মা অন্যের বাড়িতে কাজ করে। আমিও টুকটাক কাজ করে সংসারে পয়সা কড়ি দেই।
বললাম, ফেল করলি কেন?
পড়তে পারি নাই। মা অন্যের বাসায় কাজ করতে গেলে আমি আর ছোট বোন মিলে বাবার শুশ্রূষা করতাম। হয়তোবা জীবনের প্রতি অভিযোগ ছিলো বলেই আমার মা অসুস্থ বাবার খুব একটা যত্ন নিতো না। বাবাকে শুনিয়ে প্রায়শই বলতো, আপদ কবে দূর হবে? জীবনকে বুঝতে শিখেছিলাম। আমি বুঝতাম মায়ের হৃদয় গভীরে অনেক বেশি দুঃখ। দুঃখের ভীড়ে স্বামীর প্রতি মমত্ববোধ কিংবা ভালোবাসাটুকু প্রকাশ হওয়ার সুযোগ ছিলোনা। একদিন সত্যিই আপদ দূর হয়ে গেলো। আমি মাকে ডাকতে যাই নি। বাবার শিয়রে ঠায় বসে রইলাম। আমার হাত ধরে বসে রইলো ছোটবোন। হঠাৎ হঠাৎ সে বাবা বাবা বলে ডুকরে কেঁদে উঠছে। আমার অবশ্য কান্না পায়নি। হয়তো মায়ের মত করেই ভাবতে শুরু করেছিলাম যে আপদ দূর হয়েছে! স্কুল কামাই করে আর বাবার শুশ্রূষা করতে হবে না। মা যখন কাজ শেষে বাসায় ফিরলেন, আঁচ করতে পারলেন বাবা আর নেই। ময়লা কাপড় পাল্টাতে পাল্টাতে বললেন, যা হুজুররে খবর দে। এলাকার মাইনষেরেও খবর দিস। কবর খুঁড়বে। আপদটা মরেও মাইনষেরে শান্তি দিলো না।
এই বলে ছেলেটা চুপ হয়ে গেলো। কৌতুহলী চারটে চোখ তার দিকে তাকিয়ে আছি। বললাম, তারপর কি হলো?
বাবাকে দাফন করে সন্ধ্যায় বাসায় ফিরলাম। রাত হয়েছে যখন, ঘুমানোর চেষ্টা করছিলাম। তখন আমি বুঝতে পারলাম দীর্ঘসময় ধরে মা ফুঁপিয়ে কাঁদছেন। জীবনটা এমন ছিলো দিনের স্পষ্ট আলোয় একজন নারী স্বামী বিয়োগে মন খুলে কাঁদতে পারছিলো না। নির্জন অন্ধকার রাতই তার একমাত্র ভরসা। হয়তো জীবনের কাছে অনেক চাওয়া-পাওয়া ছিলো। স্বামীর একটু ভালোবাসা পাওয়ার অধিকার ছিলো। সেসবের বদলে কপলাজুড়ে ছিলো দুঃখের করুণ স্পর্শ। মাঝে মাঝে নিয়তিকে আমরা মেনে নিতে পারি না।
এই বলে ছেলেটা চোখ মুছলো। হয়তোবা আমাদের চোখেও জল নেমেছিলো।
দ্বিতীয়জন প্রশ্ন করলো আচ্ছা স্যার, ফেল করা কি খুব বড় অপরাধ?
আমি বললাম, ফেল করা কোনো অপরাধ নয়। তবে ভেবে দেখ, আমরা হলাম সবচাইতে সৃষ্টিশীল জীব। আমাদের ভেতর অভিযোজন ক্ষমতা অন্য অনেক প্রাণী থেকেও প্রবল। তাই আমাদের নিজেদের টিকে থাকার স্বার্থে আর দশজনের সাথে মানিয়ে চলতে হয়। নয়জন যদি পাশ করে তবে সেই নয়জনের পরিবেশে টিকে থাকতে হলে তোকেও পাশ করতে হবে। কিন্তু যদি নয়জন সবাই তোর সাথে সাথে ফেল করে তবে চূড়ান্ত ফলাফলটা সহজ হয়ে যায়। তখন তোকে আলাদা করে টিকে থাকার সংগ্রামে লিপ্ত হতে হবে না।
আমি তাকেও জিজ্ঞেস করলাম, তুই ফেল করলি কেনো?
সে বললো, পড়াশোনা আমার ভালো লাগে না। অপ্রয়োজনীয় বিষয় বলে মনে হয়। আমার বাবা উচ্চশিক্ষিত মানুষ। তবুও রাত বিরাতে মাতাল হয়ে ফেরে আর মায়ের গায়ে হাত তোলে। এটা যেনো নিয়মিত চিত্র। আমি তখন গল্পের নায়কদের মত টেবিলে বই-খাতা খুলে বসে থাকি। টুপ টুপ করে চোখের জলে বই-খাতার পৃষ্ঠেগুলো ভিজে যায়। এই যে হাতের রেজাল্ট কার্ডটা এটা যদি আজ বাবাকে দেই তবে বাবা এটার রেশ ধরে মাকে আরেক দফা মারতে পারবে। বই-খাতা দেখলে আমার রাগ হয়। প্রকৃত শিক্ষা পুঁথির বুলিতে থাকতে পারেনা স্যার। এই যে আজ আপনি হাত ধরে আমায় নিয়ে এলেন। এতক্ষণ সময় আপনার পাশে পাশে হাটছি আমার মনে হচ্ছে আমি আপনার ভেতর বাবার ছায়া পাচ্ছি। আমার বাবা কখনো হাতে হাত রেখে কথা বলে না। আমার কিংবা মায়ের কি অপরাধ তাও জানি না। তবে মাঝে মাঝে বাবাকে বলতে শুনি, মাকে বিয়ে করার পর বিশেষ করে আমার জন্ম হওয়ার পর বাবার ব্যবসার চরম অবনতি হতে শুরু করে। বলতে গেলে কোটিপতি বাবা এখন প্রায় নিঃস্ব হয়ে পথে বসেছে প্রায়। এটার দায় শুধুমাত্র আমার এবং মায়ের বলে উনি মনে করেন। কিন্তু আমি জানি স্যার, বাবা জুয়ায় আসক্ত। বাজি ধরে লাখ লাখ টাকা খুইয়েছেন। দেশে কিংবা বিদেশ বিভূইয়ে প্রচুর জুয়া খেলেছেন। তাই আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি পুঁথিগত বিদ্যার বুলি কপচাপো না। আমি বরং নদীপাড়ের একটা ঘাস ফড়িং হবো। অথবা আপনার মত বৈশিষ্ট্য নিয়ে একজন ভালো বাবা হবো। একজন শিক্ষিত মানুষ হবার চাইতে একজন ভালো বাবা হওয়া বেশি জরুরি। যে তার স্ত্রীকে সম্মান করবে এবং সন্তানের হাতে হাত রেখে ছন্দে ছন্দে আল মাহমুদের কবিতা আবৃত্তি করবে,
"তোমরা যখন শিখছো পড়া
মানুষ হওয়ার জন্য,
আমি না হয় পাখিই হবো,
পাখির মতো বন্য।"
ওর কথা শুনে আমি নিজের চোখকে আটকে রাখতে পারলাম না। দুচোখে অশ্রুর বান ডাকলো। দুহাতে দুজনকে জড়িয়ে ধরলাম। নিজের অতীত ইতিহাস মনে পড়লো। যখন দুমুঠো ভাতের জন্য সংগ্রাম করতে হতো। ঠিকমত খেতে পেতাম না বলে মা একদিন বড়ো আফসোস করে বললেন, করিম মহাজনের বাড়িতে লজিং মাষ্টার হিসেবে থাকবি। কথাবার্তা পাকা হয়েছে। দুবেলা খেতে দেবে বিনিময়ে ওদের ছেলেদের পড়াবি। কিছু পয়সাকড়ি যদি দয়া করে ওরা দেয় তবে তোর পড়াশোনাটা চালিয়ে যাবি। নয়তো পড়াশোনা ছেড়ে দিস। আমার খুব ইচ্ছে ছিলো তোকে সমাজের উঁচু অবস্থানে দেখবো। কিন্তু আমি জানতাম না অভাবীদের স্বপ্ন দেখা স্বভাববিরুদ্ধ।
পাতার বাঁশি যে বাজাচ্ছিলো আমি তার রেজাল্ট কার্ডটা কুঁচি কুঁচি করে ছিড়ে পানিতে ছুঁড়ে মারলাম। প্রথম জনকে বললাম আমার এক বন্ধু আছে গান শেখায়। গান শিখবি? গান শেখার পর নিজের জন্য গাইবি। নিজের আত্মার প্রশান্তির জন্য যে গান গাওয়া হয় সেই গান মানুষের পছন্দ হবে। তারা ভালোবেসে তোকে যা দেবে সেটা দিয়েই অনায়াসে জীবন পার হয়ে যাবে। নদীর তীরে ধরে হেটে যাবি দূর থেকে বহুদূর। পাশে সোনালী গমের সারি সারি শিষ। ধানের উপর ঢেউয়ের খেলা। বাদ্যযন্ত্র হাতে যখন গলা ছেড়ে গাইতে গাইতে থাকবি, প্রকৃতি নিজেই তোর গানে সাড়া দেবে।
কিন্তু স্যার, খরচ তো মা দেবে না।
খরচ আমি দেবো। কিছু পয়সাকড়ি আমার আছে।
তারপর বললাম, দুজনেই রোজ বিকেলে আমার বাসায় পড়তে আসিস। জীবনকে বুঝতে বুঝতে পড়বি। পড়ার ভেতর আনন্দ থাকবে, যত্ন থাকবে। মাঝে মাঝে আমরা ফড়িংয়ের পেছন ছুটবো। জাল দিয়ে নদী থেকে মাছ ধরবো। হাওয়াই মিঠাই খাবো। মাঝে মাঝে নদীতীরে গান গাইবো। এইতো জীবন। আমি শুধু বলি, দুঃখের কাছে হার মানিস না। হার মেনে নিলে, পরাজিতের দলে নাম লেখাতে হয়। তার চাইতে সংগ্রাম চালিয়ে যেতে ক্ষতি কি?
ওরা দুজন হঠাৎ আমার পা ছুঁয়ে সালাম করলো। ইতিহাসে এই প্রথম দুটো ফেল করা ছাত্র হয়তো শিক্ষকের পা ছুঁয়ে সালাম করেছে। আমিও হেসে ওদের জড়িয়ে ধরলাম। বললাম, যার যার বাসায় ফিরে যা। হাল ছাড়িস না।
দ্বিতীয়জনকে বললাম, একদিক হয়তো স্রষ্টা তোর আশা পূরণ হবে। একদিন একজন ভালো মানুষ এবং অবশ্যই ভালো বাবা হবি। আমি দোয়া করি। দিনের শেষে শান্ত সন্ধ্যায় ওরা যার যার নীড়ে ফিরে যাচ্ছে।
আমি শুধু দুচোখ মুছে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। আকাশের দিকে তাকিয়ে ভাবলাম, পরিবর্তন কাউকে না কাউকে আনতে হয়। আমরা ভাবি, আমরা সবাই পরাজিত। কিন্তু আমাদের প্রত্যেকের ভেতর একজন যোদ্ধা বাস করে। যাকে উপঢৌকন দিতে হয়। তাগাদা দিতে হয়। তবেই আমরা জয়ী হই। তবেই আমরা জীবনকে বুঝতে পারি। বুকে হাত রেখে অনুভব করতে পারি, এই যুদ্ধ বেঁচে থাকার যুদ্ধ।
গল্প: ওরা দু'জন
লেখক: সা' দ