09/09/2015
"" দ্বি অনুনয়""
কি স্নিগ্ধ মাখানো এই মিষ্টি সকাল টা..! দেখেছো?
--হম সত্যিই একদম ই তাই
এলেক্স আর রেন স্বামী স্ত্রী .. দুবছর হলো বিয়ে হয়েছে বাবা মা নেই কোন আত্নীয় আছে বলেও মনে হয় না কখনো কাউকে খোঁজ নিতে দেখা যায়নি সুখের সংসার... লন্ডনে থাকে রেন এর বাবা বাংলাদেশে ছিলেন এখানে এসে বিয়ে করেছিলেন রেন জন্মানোর দুমাস পর তার বাবা মারা যায়.. আর তার মা ই তাকে ছোট বেলা থেকে কোলে পিঠে করে বড় করেছে.. রেনকে অবশ্য শখের বসে বাংলা শিখিয়েছিলো তার মা, বাবার থেকে শোনা বাংলাদেশের গল্প বলতেন, বাবার অভাব কখনো বুঝতে দেননি রেনকে, একবছর আগে উনিও মারা গেছেন .. কখনো বাংলাদেশে যাওয়া হয়নি রেন এর ... এলেক্স কে সে তার আব্বুর দেশের কাহিনী বলতো তার সুবাদে বাংলা ও শিখিয়েছিলো এলেক্স কে, অপর দিলে এলেক্স এর বাবা মা এলেক্স এর বিয়ের পর ই অস্ট্রেলিয়া তে চলে গিয়েছে দুজন একা....
-- আচ্ছা তোমার আব্বু আম্মুর জন্য মন কাঁদেনা এলেক্স
-- তাতো অবশ্য কাদেঁ কিন্তু তোমার ভালোবাসার পরিমাণ টুকুর কাছে তা খুব অল্পতেই বিলীন হয়ে যায়.. তোমার এতটুকু ভালোবাসা আমার জীবনের সকল দুঃখ মুছে আবার সেই বেচেঁ থাকা ভালোবাসা টুকুই তো আমাকে তোমার কাছে টিকিয়ে রেখেছে
-- কতোটুকু ই বা ভালোবেসে ছি তোমাকে এতো ব্যস্ততার মাঝে ...
-- যতটুকু দিয়েছো অতটুকুই বা কজন পায়..
-- তুমি আসলেই অনেক ভালো এজন্য ই নিজেকে এতো ভাগ্যবান মনে করি
এভাবে কেটে যায় তাদের ভালোবাসায় স্পর্শিত মুহূর্ত গুলো .........2..........
--সকাল নয়টা বাজে রাফি তুমি এখনো ঘুমাচ্ছ
--- কে অনু?
--- নাহ তোমার বউ
---ওহ, তোহ কি হয়েছে ঘুম তো এখনো শেষ হয়নি, দাড়াও আরেকটু ঘুমিয়ে নেই
---বাজে কথা রাখ .. খেয়াল আছে আজ কয়টায় ক্লাস?
--- কয়টায়
--- দশটায়
--- কি!! আগে জাগিয়ে দিবেনা আমাকে ওফ!
--- হয়েছে যাও আরেকটু ঘুমিয়ে নাও এখনো তো তোমার ঘুম হয়নি
--- ওফফ দাঁড়াও এখুনি আসছি
দুবছরের প্রেম ... অনু আর রাফি একই কলেজে পড়ে অনার্স দ্বিতীয় বর্ষে.. প্রথম দেখায় ই রাফি কে ভালো লেগে গিয়েছিলো ... রাফি যখন ইনোসেন্ট ভাব নিয়ে একখানা হাসি দেয় মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকে অনু খুব ভালোবাসে রাফিকে রাফিও ওকে অনেক ভালোবাসে ... ওর কেয়ারিং যত্নশীল মনোভাব রাফির খুব ভালো লাগে... সারাক্ষণ এটা করোনা ওটা করো, এটা ভালো নয় ওটা ভালো, মাঝে মাঝে রাফি বিরক্তি মনোভাব দেখায় কিন্তু মনে মনে ঠিকই উপলদ্ধি করে কতটাইনা ভালোবাসে তাকে অনু... অনু কখনোই রাফি কে এমন কোন কথা না বলা থেকে থাকে যা রাফিকে চিন্তিত অবস্থায় ফেলবে.... ইতিমধ্যে তার অনেক বিবাহের প্রস্তাব এসেছে যার কিঞ্চিত পরিমাণ ও রাফিকে জানায়নি....
.......... 3. ........
ইদানিং রেনের কিছু আচরণ লক্ষ্য করল এলেক্স, কেমন যেন চুপচাপ হয়ে আছে কিছু নিয়ে ভাবছে? নাকি কোন কিছু নিয়ে চিন্তিত? খোচা দিল এলেক্সের মনে সে রেনের কাছে আসলো
-- কি হয়েছে তোমার? এতো চিন্তিত মনে হচ্ছে কেন?
-- হম ও ! কিছু হয়নি তুমি শুধুই ভাবছো
-- আমাকে ফাকি দিচ্ছ? আমাকে বলবেনা কি হয়েছে?
-- তেমন কিছু নয় ওই কাল রাতে একটা স্বপ্ন দেখেছিলাম এই আরকি..
-- কি স্বপ্ন?
-- আমাকে দেখতে পেলাম অন্য এক জায়গায়
-- কোথায়?
-- বাকিটুকু ঠিক মনে পড়ছেনা তবে কিছুটা অদ্ভুত স্বপ্ন.
-- ও কিছু নয় , ওটা নিয়ে চিন্তা করার দরকার নেই অফিসে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হও আমি নাস্তা তৈরি করছি...
-- হম
এভাবে কিছুটা চিন্তিত ভাব নিয়েই অফিসে গেল রেন... এলেক্স আবার পূর্বের কাজে মনোনিবেশ করল... হঠাৎ ওর খুব মায়ের কথা মনে পড়ছে ওর... মুহূর্তেই বিমর্ষ হয়ে গেল এলেক্সের মনটা...
.......4.......
ইদানীং বিয়ের চাপটা বেড়ে চলেছে অনুর উপর কিছুতেই ঠিক করে উঠতে পারছেনা কি করবে ... বন্ধুরা অনেক বার বলেছিল বিষয় টা রাফিকে জানানোর জন্য কিন্তু অনু কোন গুরুত্ব ই দেয়নি ..... আজ ও বন্ধুদের সাথে আবার দেখা
-- কিরে অনু কি খবর?
-- তেমন ভালো না, বাসা থেকে বিয়ের চাপটা বাড়িয়ে দিচ্ছে
-- তোকে আগেই বলেছিলাম বিষয় টা রাফিকে জানাতে,, কিন্তু তুই কোন গুরুত্ব ই দিলিনা, যাই হোক আজ রাফিকে সবকিছু খুলে বলবি নাহলে সমস্যা টা অনেক বড় হয়ে যাবে
-- হম দেখি কি করা যায়
বলে বন্ধুদের বিদায় জানিয়ে রাফির কাছে গেল অনু.... বুঝে উঠতে পারছেনা কি করবে ও.. রাফিকে সবকিছু খুলে বলে.... ভয়ঙ্কর সিদ্ধান্ত হীনতায় ভুগছে অনু
-- তোমাকে এরকম দেখাচ্ছে কেন?
-- ও কিছু নয় এমনি এরকম লাগছে তোমার কাছে
-- কিছু তো হয়েছে ... প্লিজ বলো আমায়
-- কাল বলি? আজ ভালো লাগছেনা
-- আচ্ছা যখন তোমার এখন বলতে ইচ্ছে করছেনা আমি জোর করবোনা, তবে কাল অবশ্যই আমাকে জানাবে...
-- আচ্ছা আসি
বলে বিদায় নিয়ে চলে এল অনু... বাসায় আজ খুব তাড়াতাড়ি চলে আসল কোন কিছুতেই মন বসছে না ওর... অপর দিকে রাফিও চিন্তিত বুঝতে পারছেনা কি হয়েছে অনুর... চোখের কোণে জল আসল অনুর আজ সে রাফিকে চিন্তার মধ্যে ফেলে এসেছে যাকে একটিবারের জন্যও দুশ্চিন্তায় ফেলতে দেয়নি অনু তাকে আজ ইচ্ছে করে দুশ্চিন্তার মধ্যে ফেলে আসল.! নিঃশ্বাস ভারি হয়ে ওর...
.......5.......
আজ আগের দিনের চেয়ে বেশি বিষন্ন অবস্থায় দেখা যাচ্ছে রেনকে... এলেক্স এবার কিছুটা চিন্তিত হয়ে পড়লো..
-- কি হয়েছে তোমার খুলে বলোনা?
-- একটা স্বপ্ন প্রতিদিন দেখতে পাচ্ছি, আমি আমাকে অন্য কোন জায়গায় দেখছি ভিন্ন এক পরিবেশে আর দেখছি আমি কলেজের ছাত্র ... তুমিও আছো সেখানে,, একসাথে প্রেম করছি দুজন .. আজ চার পাঁচদিন যাবৎ একই স্বপ্ন দেখে যাচ্ছি..
--বলোকি? অদ্ভুত তো! চল ডাক্তারের কাছে যাই
রেনকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেল এলেক্স ... সব সমস্যা খুলে বলল রেন..
-- ওনাকে ওনার পছন্দের কোন জায়গায় ঘুরতে নিয়ে যান দেখবেন সব ঠিক হয়ে যাবে...
-- আচ্ছা ডক্টর, আসি
বলে বাসায় নিয়ে আসলো রেনকে.... রেনকে বলল ও
-- আচ্ছা কোথায় ঘুরতে যাওয়া যায়?
-- চলো বাংলাদেশে যাই
-- বাংলাদেশ? কেন?
-- আমার বাবার জন্মভূমি ছিলো .. খুব যেতে ইচ্ছে করছে ওখানে
-- আচ্ছা ডান
বলে তারা বাংলাদেশে যাওয়ার জন্য মনস্থির করলো
........6........
রাফিকে সবকিছু খুলে বলল অনু..
-- এতোদিন বলোনি কেন আমায়?
-- তোমায় দুশ্চিন্তায় ফেলতে চাইনি.. কিন্তু তারা আমাকে না জানিয়ে আমার বিয়ে ঠিক করে ফেলেছে ...
-- তুমি আমার কথা বলোনি?
-- বলেছি কিন্তু তারা তাদের পছন্দের ছেলের সাথে আমাকে বিয়ে দিবে... আমি তোমাকে ছাড়া অন্য কাউকে বিয়ে করতে পারবোনা রাফি
রাফি ও অনু বন্ধুদের সাথে বিষয় টি নিয়ে আলোচনা করল ... এবং এই সিদ্ধান্তে উপনীত হলো যে তারা পালিয়ে যাবে,, পালিয়ে গিয়ে চট্টগ্রাম এক বন্ধুর বাসায় উঠবে.. ওই বন্ধুর বাবা মা আমেরিকায় থাকে
-- অনু তুমি পারবে তো?
-- তোমার জন্য আমি যা কিছু করতে পারি তার তুলনায় এটা অতি নগন্য...
বলে দুজনের দিকে দুজন কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে...
-- কাল ভোরে তুমি কলেজের সামনে চলে আসবে অনু
-- আর রাফিকে কি করতে হবে তা আমরা শিখিয়ে দেব
বলে ওদের দুজন কে বিদায় দিল ওদের বন্ধু্রা
সকালে ভোরে সবার চোখ এড়িয়ে কলেজের সামনে চলে আসলো অনু এসে দেখে রাফি বাইক নিয়ে দাড়িয়ে আছে
-- সবকিছু ঠিকআছে তো?
-- হম ঠিকআছে (কিছুটা ভারী কন্ঠস্বর)
রাফি বুঝতে পারল যে সবাইকে ছেড়ে যেতে বুক ফেটে যাচ্ছে অনুর.. কিন্তু এছাড়া কোন উপায় নেই অন্য কোন রাস্তা নেই....
-- পেছনে উঠে বসো
-- হম
-- সাবধানে .. ঠিক করে ধরে বসো
বলেই বাইক স্টার্ট নিল ...
.....7.....
বাংলাদেশে পা রাখলো রেন আর এলেক্স .... কাল সিদ্ধান্ত নেয়ার পর আর তর সয়নি রেনের টিকিট কেটে পুরোদস্তুর ভাবে চলে এসেছে ... নেমেই আবার ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম এর উদ্দেশ্যে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রূটের বিমানে উঠল কক্সবাজার দেখার খুব ইচ্ছে হচ্ছিল... বিমান এ উঠলো আবার দুজন , এবার বিমান কিছুটা নিচ দিয়ে যাওয়াতে বাংলাদেশের সৌন্দর্য দৃষ্টি কারলো ওদের নদীমাতৃক বাংলাদেশের নদী গুলো খুব সুন্দর দেখাচ্ছিল, মনে হচ্ছিল একটা সাপ একেবেকে চলেছে ,
অবশেষে তারা চট্টগ্রাম এসে পৌছল.. পৌঁছে ই পড়লো বিপাকে..বাইরে বের হওয়ার সাথে সাথেই পুলিশ তাদের এরেস্ট করল, তারা দুজনেই রীতিমতো অবাক বনে গেল
-- কি হলো আমাদের এরেস্ট করলেন কেন? (রেনের বিস্মিত কন্ঠে প্রশ্ন)
-- আপনাদের নামে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা রয়েছে
-- কি অপরাধ করেছি আমরা?
-- তা এই মুহূর্তে বলা সম্ভবপর হচ্ছেনা, গেলেই বুঝতে পারবেন ..
দুজনে ই খুব বিস্মিত হলো পুলিশের কথায় .. তারা কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছেনা তাদের কি অপরাধ হতে পারে ...
......8.......
অনুর বাবা খুব ক্ষমতাধর ছিলো সকালে মেয়েকে না পেয়ে পুলিশ কে ছবি দিয়ে গ্রেফতার করার নির্দেশ দিয়েছিল ...
খুব দ্রুত বাইক চালাচ্ছিল রাফি.. চোখে মুখে ভয়ের আভাস ফুটে উঠছিল তাদের.. হঠাৎ আচমকা মোড় পড়ল সামনে রাফির অসচেতনতার দরুন তাদের কে নিক্ষিপ্ত হতে হলো গর্তে .... একটি অসমাপ্ত প্রেমের ইতি ঘটলো ... মৃত্যু তাদের প্রেম কে বরণ করে নিল তার নির্মম চিরন্তন প্রবাহিত বরণডালায়...
অপর দিকে পুলিশ পরদিন তাদের (রেন,এলেক্স)কে নিয়ে আসলো অনুদের বাড়ি.. বাবা মা দেখে অবাক
-- এটা করতে পারলি তুই?
-- কে কি করলো? (এলেক্স বিস্মিত হয়ে বলল)
-- তুই এরকম করে কথা বলছিস কেন? আর কি পড়েছিস এসব ( বি:দ্র: এলেক্সের সাথে অনুর চেহারা মিল ছিলো)
-- দেখুন আমি অনু নই আমি এলেক্স আর এ আমার স্বামী রেন, আমরা ইংল্যান্ড এর অধিবাসী
ইতিমধ্যে রাফির বাবা মা ও এসে উপস্থিত হয়েছে
-- রাফি বাবা আমার তুই এটা কি করে করলি ( রেনকে নির্দিষ্ট করে)
-- কে রাফি? আমি রেন
-- কি আবোল তাবোল বকছিশ
ইতিমধ্যে হাইওয়ে পুলিশ বাসায় এসেছে আর সাথে কলেজের কিছু ছেলে মেয়ে, তারা দুটি লাশ পেয়েছে..
--আমরা দুটো লাশ পেয়েছি আইডি কার্ড থেকে কলেজের নাম এবং কলেজ থেকে জানতে পেরেছি একটি লাশ এই পরিবারের ....
সবাই বিস্ময়ের ঘোরে আবদ্ধ হলো .. একবার লাশের দিকে তাকাচ্ছে একবার রেন ও এলেক্সের দিকে
--তাহলে আপনারা কারা (পুলিশ ইন্সপেক্টর)
-- এতক্ষণ পর তারা তাদের পরিচয় পত্র দেখানোর সুযোগ পেল
রেনের মনে পড়লো তার স্বপ্নের কথা.. কলেজের বন্ধুরাও অবাক হলো জমজ অনু রাফিকে দেখে..
-- আপনাদের দেখতে অবিকল রাফি অনুর মতো
-- সেটাই তো দেখছি
-- তোহ আপনারা বাংলাদেশে কেন?
তারপর সবকিছু খুলে বলল রেন, স্বপ্ন থেকে সবকিছু .. তারপর পরিচয় থেকে যখন রাফির বাবা জানতে পারলো রেনের বাবা বাংলাদেশী এবং এই অঞ্চলের ই তখন রেনের বাবার নাম জিজ্ঞাসা করলো রাফির বাবা
-- মুস্তাফিজুর
-- মুস্তাফিজুর! এতো আমার ভাইয়ের নাম যে অনেক আগে বাহির দেশে চলে গিয়েছিল
সবাই কান্না করতে ভুলে গেছে এই কাহিনী শুনে
-- তুমি মুস্তাফিজুর এর ছেলে মানে আমার ভাতিজা
-- রেন ও অবাক হয়ে গেল
সবাই অনু আর রাফির কথা ভুলে ই গেছে .. হঠাৎ খেয়াল করল পুলিশ দুটো লাশ পোস্ট মডেমের জন্য নিয়ে গেছে ... কান্নায় ভেঙে পড়েছে অনুর মা...
এলেক্স আর রেন প্রথম এরকম ফ্যামিলি স্পর্শ পেয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েছে
-- আমাকে তোমার রাফি ভেবে রাখবে চাচা তোমার কাছে?
-- তুই তো আমার সন্তান ই.. তোকে আমি ছেড়ে দিতে পারি?
অপরদিকে এলেক্স গেল অনুর মাকে স্বান্তনা দিতে
-- তুমি ইচ্ছে করলে আমাকে তোমার মেয়ে হিসেবে ভেবে নিতে পারো.
-- এলেক্স জড়িয়ে কাদতেঁ কাদতেঁ বলল আমি আমার মেয়েকে আবার ফিরে পেলাম.
এক আবেগমুখর পরিবেশের সৃষ্টি হলো ...
..........সমাপ্ত..........