08/09/2026
ইসলামের দৃষ্টিতে হিবা/উইল ও আজীবন ভোগাধিকার: বিস্তারিত বিশ্লেষণ....
📗এধরনের জগাখিচুরি প্রস্তাবিত আইন শরিয়তের মূলনীতির সাথে পুরোটাই সাংঘর্ষিক। হিবায় মালিকানা হস্তান্তরের পর আজীবন ভোগের শর্ত ফিকহে হানাফি মতে মূলত বাতিল। তদুপরি পদ্ধতিগত কিছু বিকল্প আছে। উইলের ক্ষেত্রেও একই নীতি প্রযোজ্য, তবে শর্ত হলো এক-তৃতীয়াংশের সীমার মধ্যে হতে হবে।
১. কুরআনের দলীল:
★ সম্পত্তির স্বচ্ছন্দ হস্তান্তর ও ন্যায়:
يُوصِيكُمُ ٱللَّهُ فِيٓ أَوْلَٰدِكُمْۖ لِلذَّكَرِ مِثْلُ حَظِّ ٱلْأُنثَيَيْنِ
"আল্লাহ তোমাদের সন্তানদের বিষয়ে নির্দেশ দিচ্ছেন: পুরুষের অংশ দুই নারীর সমান।" (সূরা আন-নিসা: ১১)
ব্যাখ্যা: কোনো ব্যক্তি নিজ সম্পত্তি এমন শর্তে দিতে পারবেন না যা স্বাভাবিক উত্তরাধিকার বা মালিকানার নিয়মকে সম্পূর্ণরূপে বাতিল করে দেয়।
★ চুক্তি ও শর্তের নিয়ম:
يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوٓاْ أَوْفُواْ بِٱلْعُقُودِ
"হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা চুক্তি পূরণ করো।" (সূরা আল-মায়িদা: ১)
মাসআলা: শর্তটি শরিয়তসম্মত হলেই পূরণ করতে হবে; শরিয়তবিরোধী হলে শর্ত অবৈধ।
২. হাদীসের দলীল:
★ হিবার মূল শর্ত-
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন: "দান (হিবা) তখনই পূর্ণ হয়, যখন দখল হস্তান্তর করা হয়।" (সুনানে ইবনে মাজাহ)
মাসআলা: মালিকানা দিলে সম্পূর্ণরূপে গ্রহীতার হয়ে যায়—আংশিক বা শর্তযুক্তভাবে নয়।
★ কুরআন সুন্নাহ বিরোধী শর্ত নিষিদ্ধ-
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন: "কোনো দান 'এই শর্তে যে আমি আজীবন ভোগ করবো' এমন শর্ত করা জায়েয না । যে শর্ত আল্লাহর বিধানের বিরুদ্ধে, তা সবসময় বাতিল।" (সুনানে আবু দাউদ)
★ উত্তরাধিকারের স্বাভাবিক প্রবাহ-
"কোনো উত্তরাধিকারীকে উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত করা বৈধ নয়।" (জামে তিরমিজী)
৩. ফিকহে হানাফির বিশ্লেষণ:
▪️ হিবার সংজ্ঞা ও শর্ত
হিবা: "বিনা প্রতিদানে একজন জীবিত ব্যক্তি থেকে অন্য জীবিত ব্যক্তির কাছে তাৎক্ষণিকভাবে মালিকানা হস্তান্তর করা।" (আল-হিদায়া, কিতাবুল হিবা)
প্রয়োজনীয় রুকন: ইজাব (ঘোষণা), কুবুল (গ্রহণ), কবজা (দখল হস্তান্তর)। তিনটি পূর্ণ হলেই হিবা কার্যকর হয়। অন্যথায় নয়।
▪️ "আজীবন ভোগ" শর্তের বিধান
★ মূল নিয়ম:
হিবার সাথে এমন শর্ত যুক্ত করা যায় না যা মালিকানার স্বাভাবিক ফলাফলকে বাধাগ্রস্ত করে।
হানাফি মতে: "দান করে 'আমি আজীবন ভোগ করবো' বললে হিবা হবে তবে ভোগ করার শর্তটি বাতিল হয়ে যাবে। (ফাতাওয়া আলমগীরী)
কারণ: এটি মালিকানা ও ভোগাধিকারকে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা, যা ইসলামি সম্পত্তি আইনের বিপরীত।
🔸 মতপার্থক্য:
▪️ইমাম আবু হানিফা ও ইমাম আবু ইউসুফ বলেন শর্ত সম্পূর্ণ বাতিল, গ্রহীতা সম্পূর্ণ মালিক হবেন।
▪️ইমাম মুহাম্মদ বলেন, যদি শর্তটি প্রচলিত রীতি অনুযায়ী হয়, তবে হিবা বাতিল হয়ে যায়, না হয় বিক্রয় বা অন্য পদ্ধতি বেছে নিতে হবে।
▪️ উভয় মতেই, হিবা দিয়ে আজীবন ভোগের আইন স্থায়ী করা যায় না।
৪. উইলের ক্ষেত্রে বিধান:
▪️উইল শুধুমাত্র মৃত্যুর পর কার্যকর হয় এবং সম্পত্তির এক-তৃতীয়াংশের বেশি করা যায় না—বাকি দুই-তৃতীয়াংশ স্বাভাবিক উত্তরাধিকার সূত্রে বণ্টিত হবে।
▪️ উইলেও "আজীবন ভোগ" শর্ত যুক্ত করলে তা বাতিল হবে। (আল-হিদায়া)
💠 বৈধ বিকল্প পদ্ধতি
যদি বাবা-মা আজীবন নিরাপত্তা চান, তবে শরিয়তসম্মত পথ হলো:
★ হিবা বিল ইওয়াজ:
সন্তানের কাছে সম্পত্তি দানের বিনিময়ে "আজীবন ভোগ ও যত্ন নেবে" এ শর্তে লিখিত চুক্তি করুন—এটি বিক্রয়সদৃশ বিধানে বৈধ।
★ ওয়াকফ করে ভোগাধিকার রাখা:
সম্পত্তি ওয়াকফ করে প্রথমে নিজেদের আজীবন ভোগ, পরে সন্তানদের দানের ব্যবস্থা করা।
★ আরিয়াত (উপকার দান):
মালিকানা না দিয়ে শুধু আজীবন ব্যবহারের অনুমতি দিন—মৃত্যুর পর মালিকানা ফিরে আসবে।
৫. রাষ্ট্র কর্তৃক প্রস্তাবিত আইনের সাথে শরিয়তের সংঘাত:
★ মূল বিরোধ:
আইনে বলা হচ্ছে "হিবা/উইল করলেও বাবা-মা আজীবন ভোগ করতে পারবেন"—এটি ইসলামি আইনে হিবার সংজ্ঞা ও প্রাকৃতিক ফলাফল বিনষ্টকারী । হিবা মানেই সম্পূর্ণ মালিকানা হস্তান্তর।
★ ফলাফল:
এই আইন অনুযায়ী শর্ত করলে শরিয়তের দৃষ্টিতে সেই শর্ত কার্যকর হবে না, তবে দেশের আইনে সেটা মান্য হলেও মারাত্মক দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করবে।
উপসংহার
🔘শুধু হিবা বা উইল দিয়ে আজীবন ভোগ নিশ্চিত করা যাবে না।
🔘বরং হিবা বিল ইওয়াজ, ওয়াকফ বা আরিয়াত পদ্ধতি বেছে নিন—যা দ্বারা উভয় পক্ষের নিরাপত্তা রক্ষা পাবে এবং শরিয়তও পূর্ণাঙ্গভাবে পালিত হবে।
মাওলানা মাহবুবুর রহমান তাজ
ইমাম ও খতিব – ইসলামিক স্কলার
নিউকাসল, ইউ,কে