06/06/2020
ডুয়ার্সের ভ্রমণ এবার মাত্র চারদিন । ভোর-ভোর আলিপুরদুয়ার নেমে টোটো নিয়ে সোজা দমনপুরের "বাদলবীনা গেস্ট হাউস"। একদিন বক্সা দুর্গ অভিযান। একদিন দমনপুরের হাট। বাকী দুদিন পূর্ণ বিশ্রাম। ব্যাস।
সকালে বেড়িয়ে সান্তালেবাড়ি থেকে পায়ে হেঁটে বক্সাদুর্গ ঘুরে আবার সান্তালেবাড়ি । রাস্তায় কিনেছি ছোট্ট ছোট্ট লাড্ডু সাইজের বন থেকে পেরে আনা কমলালেবু । দশটাকায় কুড়িটা । কি মিস্টি-কি মিস্টি !! নেপালী ভাষায় সান্তালে মানে কমলা । ঐ নামেই জায়গা । লেবুর মতোই মিস্টি লোকজন। সেখানে গরম গরম ম্যাগী আর গ্লাস ভর্তি চা খাওয়া হল । গিন্নীর কাছে বক্সাদুর্গ অব্দি ট্রেক করাটা একটু চ্যালেঞ্জিং ছিল, সেটা ভালোভাবে উতরোতে পেরে তার বডি ল্যাঙ্গোয়েজ পালটে গেছে ।
গিন্নী--"ধুর, মাত্র সাড়ে এগারোটা বাজে । চলো একবার জয়ন্তী ঘুরে যাই । সময় প্রচুর হাতে আছে ।"
প্রস্তাব শুনে মেয়ে উত্তেজিত ।
আমি--"চল । বাইরে বেড়াতে এসে আমার কোন কিছুতেই আপত্তি নেই ।"
গাড়ি সান্তালেবাড়ি থেকে কিছুটা এগিয়ে এসে বাহাতের রাস্তা ধরলো । গেল বার জয়ন্তী জঙ্গলের কোর এলাকায় সাফারি করতে গিয়ে হাতির পালের মুখোমুখি হয়েছিলাম । তারপর থেকে হাতির ব্যাপারে গিন্নীর একটু ভয় ধরেছে ।
মেয়ে--"বাবা এই রাস্তায় হাতি বেরোয়?"
আমি--"প্রায়ই বেরোয়।"
গিন্নী-- " ফালতু কথা বলোনা।"
আমি-- " ড্রাইভারকে জিজ্ঞেস করো । কিরে পরাণ হাতি বেরোয় না ?"
ড্রাইভার-- " রোজই বেরোয় । তবে হাতির থেকে সাংঘাতিক বাইসন । বাইসন ভীষণ গোঁয়ার । কাল আমার এক বন্ধুর গাড়ির সামনের কাঁচ ভেঙ্গে দিয়েছে । এই জঙ্গলেই ।"
গিন্নী আবার বসেছে সামনে, ড্রাইভারের পাশে । দেখি চোখ ছোট করে সামনের রাস্তা দেখে যাচ্ছে ।
গিন্নী-- " পরাণ সাবধানে গাড়ি চালাও । রাস্তায় নজর রেখো ।"
মিনিট পাঁচেক পরেই জয়ন্তী পৌঁছে গেলাম । নদীর পাড়ে ঘুরে, জঙ্গলের গাইড গোপালদার সঙ্গে চা খেয়ে ব্যাক টু বাদলবীনা । দেখি বাহাদুরদা আর রেখাদি লাঞ্চ রেডি করে অপেক্ষা করছে ।
বিকেল থেকে দু এক পশলা করে বৃষ্টি হচ্ছে, সঙ্গে ঠান্ডা হাওয়া । গোটা লজে আমরাই আছি । বার দুয়েক চা খাওয়া হয়ে গেছে । রানাদা এসেছিলেন, খুব আড্ডা হল । মেয়ে ক্যামেরা নিয়ে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে তক্ষকের ছবি তোলার জন্য । রাত বাড়তেই আমাদের তিনজনের গান শুরু হল । কেউ কোথাও নেই, বেসুরো গলা খুলে গান গাইছি । শ্রোতা একমাত্র বাহাদুরদা । খুব মিষ্টি গলায় নেপালী লোকগীতি গাইতে পারে । আমাদের সামনে কিছুতেই গাইবে না । মহা জ্বালা ।
বৃষ্টির মধ্যেই শুনতে পাচ্ছি এক বাচ্চা কুকুর ক্রমাগত ডেকে যাচ্ছে । খুব দূর্বল, ক্লান্ত গলা। বাহাদুরদা মেয়েকে নিয়ে ওটাকে উদ্ধার করে নিয়ে এল রান্নাঘরের পেছন থেকে । ঠান্ডায় ঠকঠক করে কাঁপছে । বিস্কুট এলো । জলে ভিজিয়ে খাওয়ানো হল । চাদরে জড়িয়ে বুকের কাছে চেপে রাখলাম । ঘুমিয়ে পড়লো । খাবার ও উষ্ণতা পেয়ে একেবারে ঘুমিয়ে কাদা । চেয়ারের গদির উপর কাপড় জড়িয়ে শুইয়ে দিলাম । মহারাজ তখন গভীর ঘুমে ।
তখন ভোর সাড়ে চারটে বাজে, ভীষণ ঠান্ডা । আমি কম্বলের উপর কম্বল চাপিয়েছি । দরজার বাইরে কুঁইকুঁই ডাক আর দরজা ঠেলার শব্দ । আমি এক খাটে আর মা-মেয়ে আরেক খাটে ।
মেয়ে-- " বাবা শুনতে পাচ্ছো? "
আমি-- " পাচ্ছি তো ।"
মেয়ে উঠে দরজা খোলামাত্র কাঁপতে কাঁপতে ঢুকে এল । সঙ্গে সঙ্গে মেয়ে কম্বলের তোলায় নিয়ে কোলে চেপে ধরলো ।
আমি--"কিছু আছে খাবার মতো ।"
গিন্নী-- " চিড়ে ভাজা আছে ।"
মেয়ে-- " এই টুকু বাচ্চা চিড়ে ভাজা খাবে? আর কিছু নেই ।"
গিন্নী-- " ঐ কালকে সকালে কেনা কমলালেবু আছে ।"
মেয়ে আমার দিকে চাইলো । করুণ দৃষ্টি ।
আমি এবার উঠে সোয়েটার-মাফলার চাপিয়ে বেরলাম । যদি কিছু পাই । রেললাইন পার হয়ে বড় রাস্তায় উঠলাম । চেকপোস্টের কাছের চায়ের দোকান বন্ধ । স্টেশনের দিকে হাঁটতে শুরু করলাম, যদি কোন দোকান খোলা পাই । অনেকটা আসার পর দেখি একটা চায়ের দোকান সবে খুলছে ।
আমি--" দাদা পাউরুটি আছে? "
দোকানী-- " বানরুটি আছে । তিনটাকা দাম ।"
আমি-- " দুটো দিন । এই যে পঞ্চাশ টাকার নোট ।"
দোকানী-- " খুচরো নেই । বসুন, চা খান । তারপর দেখছি ।"
খুচরোর প্রয়োজনের থেকে চায়ের লোভ বেশি ।বসে পরলাম । দুকাপ চা খেয়ে রুটি নিয়ে ফিরে দেখি ঘরে মা-মেয়ে আর ক্ষুদে ছানা, তিনজনই গভীর ঘুমে ।
তারপর অতিথিকে খাওয়ানো হল । তিনি ঘরময় ঘুরতে থাকলেন । সকালের রোদ বাইরে ঝলমল করছে ।বাহাদুরদাও চলে এসেছে । হঠাৎ শুনি বাইরে ঘেউঘেউ ডাক । মাতাশ্রী বোধহয় এলেন ।
ছানাটাকে মাটিতে ছাড়তেই মা এসে চেটেচুটে আদর করলো । তারপর আমাদের দিকে তাকিয়ে ঘ্যাঁক করে একটা আওয়াজ করে উল্টোদিকে চলে গেল । ছানাও নাচতে নাচতে মায়ের পেছন ধরলো ।
মেয়ে--" বাবা, ঘ্যাঁক মানে কি ধন্যবাদ? "
আমি-- " হলেও হতে পারে ।"
ফিরে দেখি বাহাদুরদা হাসছে, হাতে গরম গরম ধোঁয়া ওঠা দুধ চা ।
।। গুরুদাস গাঙ্গুলী ।।