10/08/2024
সংগৃহীত এবং পরিমার্জিত : 'রোল-মডেল'
বলুন তো, সেরা আত্মসংযমী বাঙালি কে?
বিশাল চাটুর মধ্যিখানে ডিম ফেটিয়ে ঢেলে তার ওপর ময়দার পরোটা আলতো করে রেখে ভাজা হল। তারপর সেই মুচমুচে কিন্তু নরম পরোটার ঠিক মধ্যিখানে চিকেন কাবাব,নুন-লঙ্কা-পেঁয়াজ- ক্যাপসিকাম-মশলা-সস-পাতিলেবুর রস দিয়ে পরোটাটি দক্ষ হাতে মুড়ে নীচের অংশে সাদা কাগজ জড়িয়ে আপনার দিকে বাড়ানো হল। আর পুরো প্রসেসটা দেখে ও শুনে (খুন্তি দিয়ে লোহার চাটুতে ঠং ঠং করে মারার শব্দ) যদি আপনার মুখের ভেতর এক্সট্রা জল চলে না আসে, তবে তার থেকে বড় আত্মসংযমী বাঙালি আর হয় না ?
ঠিক বুঝেছেন, আজ বাঙালির অন্যতম সেরা স্ট্রীটফুড নিয়ে আজকের এই পোস্ট !!
ভাত-ডাল-আলুপোস্ত আর ফুচকার পরেই যে খাদ্যবস্তু বাঙালির রসনা দখল করে রেখেছে তা হল রোল। হলফ করে বলতে পারি রোল না খাওয়া বাঙালি খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। আর হবে নাই বা কেন কোলকাতা ঘরানার রোলের জন্ম যে এই শহরেই, আজ থেকে নব্বই বছর আগে। ধর্মতলার নিজাম হোটেলে চালু হয় কাঠি-রোল। তার আগে কাবাব আর পরোটা আলাদা আলাদা বিক্রি হত। শোনা যায় জনৈক বিদেশী খাওয়ার সময় হাতে তেল যাতে না লাগে তাই কাঁটা-চামচ দিয়ে চেষ্টা করছিল। কিন্তু শেষে নাস্তা করতে গিয়ে নাস্তানাবুদ। তখন হোটেলের বাবুর্চি পরোটার মধ্যে কাবাব মুড়ে তার ওপর মোম-কাগজ জড়িয়ে পরিবেশন করল। শুরু হল বাঙালির খাদ্য-সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ, রোলের জয়যাত্রা!
কাঠি-রোলের শুরুয়াত নিজামে হলেও আপামর কোলকাতাবাসীর রসনা তৃপ্তিকর এগরোলের সূচনা আরও পরে, সত্তরের দশকে। সেই সময় পাড়ায় পাড়ায় এক নতুন ধরনের খাবারের দোকান চালু হল। অস্থায়ী গুমটি, তাতে দু’জন লোক। একজন মস্ত গরম চাটুতে ডিম ফেটিয়ে-পরোটা ভেজে সড়াৎ করে পাশের স্ল্যাবের ওপর ফেলছে আর দ্বিতীয় জন সঙ্গে সঙ্গে তার মধ্যে পেঁয়াজ-লঙ্কা কুঁচি, নুন-মশলা আর দু’রকম সস ঢেলে রোল করে কাগজে মুড়ে কাস্টমারের হাতে দিচ্ছে। রোলের ভেতর চিকেন বা পনীর তখন দেখা যেত না। ওনলি এগরোল। সাথে অবশ্য এগ-চাউমিনও ছিল, তবে তার গল্প অন্য আরেক দিন হবে। আজ শুধুই রোল!
ছোটবেলায় পাড়ার মোড়ে,অনাথদার রোলের দোকানে রোল তৈরি করা দেখা আমার নেশা ছিল! রোল-কারিগর হতে চাইনি কখনও তবু ওরকম ভাবে রোল তৈরি করতে পারা ছিল আমার স্বপ্ন। সে স্বপ্ন পূরণ হয়নি, যদিও বাড়িতে রোল তৈরির সময় গিন্নীর পরোটা আর ডিম ভাজার পরবর্তী কাজটা, মানে ঐ পেঁয়াজ-শসা-সস সহযোগে মুড়ে দেওয়াটা আমিই বেশীরভাগ ক্ষেত্রে করি, তবু সেই পারফেকশন আনতে পারিনি। জানি, আজীবন এই নিয়ে মনে দুঃখ রয়ে যাবে!
চটজলদি খাবার হিসেবে, রাস্তাঘাটে টিফিন হিসেবে, বন্ধু-কলিগদের ছোট্ট ট্রিট দেওয়াতে রোলের জুড়ি মেলা ভার। শুধু এগরোল নয়, পনীর, ফিশ, চিজ, চিকেন, মাটন, এগ-চিকেন, এগ-মাটন, ডাবল এগ-চিকেন,ডাবল এগ-মাটন এমনকি বিভিন্ন রকমের চিকেন- তন্দুরি, বার-বি-কিউ, কিমা, টিকিয়া, চিলি-চিকেন ইত্যাদি প্রভৃতি রকমারি রোলের এখন অভাব নেই! সস আছে তার সাথে দশবারো রকমের!
চলুন, জেনে নিই কোলকাতার কিছু নামজাদা রোলের সুলুকসন্ধান :
অফিস পাড়া, পার্ক স্ট্রীটে এশিয়াটিক সোসাইটির দিক থেকে যাত্রা শুরু করলে পড়বে ' ‘হটকাটি রোল' সবসময় ভীড়, রোলের হরেকরকম ভ্যারাইটি পাবেন এই দোকানে। খেতেও দারুণ। ঐ ফুটপাত ধরে আরও এগোলে পার্ক হোটেল ছাড়িয়ে কারনানি ম্যানসনের পাশেই ‘কুসুম রোল’, যার জন্ম ১৯৭১ সালে।অনেকবার খেয়েছি এদের ডাবল এগ-চিকেন রোল, আমার ফেভারিটদের মধ্যে অন্যতম!
নিউ মার্কেট চত্বরে সেরার সেরা নিজাম তো আছেই। এছাড়া আছে ‘বাদশা’ বার এন্ড রেস্টুরেন্ট। লিন্ডসে স্ট্রিটে, শ্রীলেদার্সের পাশে। এখানে বসে রোল খাওয়া যায়। পুরানো দিনের আসবাব আর নস্ট্যালজিয়ার মাঝে বসে রোলের স্বাদগ্রহণ ; সত্যিই ‘বাদশাহী' আর লাজবাব। এদের ডাবল মাটন রোল, জাস্ট...অপূর্ব!
মল্লিকবাজারে, এ.জে.সি.বোস রোড আর শেক্সপিয়ার সরণীর জাংশনে‘ শের-ই-পাঞ্জাবে’র রোল খায়নি অথচ কলামন্দিরে গেছে, এ ঘটনা বিরল !
দক্ষিণে গড়িয়াহাটে শপিং করতে গিয়ে ‘বেদুইনে’র রোল খাওয়া তো অবশ্য কর্তব্যের মধ্যে পড়ে। এদের ফিশ টিকিয়া রোলের বেশ নাম। এই চত্বরেই কয়েকটি ভাল রোলের দোকান আছে। পরমা , বঙফ্রাই আর ক্যাম্পারী!
এইসব ডাকসাইটে আদি রোল সেন্টারের বাজারে ভাগ বসিয়েছে আমিনিয়া, আরসালান, জিশান, বেহালার হাজি সাহেব (১৯৯৫), সল্টলেক - নিউটাউনের জাব্বর আফগানী (২০১১), রোল ফ্যাক্টরি ; কসবা রাজডাঙার 'ফিস্ট' এরকম বেশ কিছু জায়েন্ট প্লাস নতুন কিছু ফিউশন রোলের জয়েন্ট। খেতে অবশ্যই ভাল, তার থেকেও ভাল এদের প্যাকেজিং! আমিনিয়ার রোল হোম - ডেলিভারি পেলে মনে হয় অতি মূল্যবান কোন জিনিস এসেছে, এত যত্নের প্যাকিং। হাজি সাহেবের রোল অতি উপাদেয়। সুদূর বেহালা গিয়ে তাও খেয়ে এসেছি। খাওয়া হয়নি জাব্বর আফগানীর রোল। শুনেছি সে নাকি রোল নয় রোলের ঠাকুরদা। ইয়াব্বর সাইজ, দৈর্ঘ্যে ও প্রস্থে। একা একজনের পক্ষে খাওয়া অসম্ভব!
তবে, শেষ করার আগে জানিয়ে রাখি রোল খেতে গেলে কতগুলো নিয়ম অবশ্যই পালন করতে হবে। তা নাহলে রোলের স্বাদ খোলতাই হবে না?
* রোলের দোকানের বাইরে দাঁড়িয়ে রোল খেতে হবে। বসে রোল খাওয়া আর জল ছাড়া ফুচকা খাওয়া এক।
* রোলের অর্ডার দিয়ে মোবাইল ঘাঁটা যাবে না। রোল তৈরী দেখতে হবে। আর ভাল হয় যদি চোখ দিয়ে গিলে খাওয়া মার্কা নজর রাখতে পারেন।
* রোল-দাদা বা কাকুকে অযথা তাড়া দেওয়া যাবেনা। তাহলে মুচমুচে অথচ নরম পরোটা পাওয়া মুশকিল।
* স্যালাড-পেঁয়াজ দেওয়ার সময় কাকুকে টম্যাটো ও চিলি সস দিতে একদম বারণ করে দেবেন। শুধু মশালা আর লেবুর রস। নাহলে মিষ্টি সস রোলের স্বাদই পাল্টে দেবে।
* প্লেটে নৈব নৈব চ। রোল সরাসরি হাতে নিতে হবে।
* কাগজের আস্তরণ খোলা একটা শিল্প। ভালো রোলশিল্পী কাগজ জড়ালে সে কাগজ না ছিঁড়েই পুরো রোল খাওয়া সম্ভব। রোল কামড়ে ধরে রেখে হাত দিয়ে আলতো করে কাগজ নীচের দিকে টানলে না ছিঁড়ে বেরিয়ে আসলে সেই রোলশিল্পীর হাতে অবশ্যই চুমু দেওয়া উচিত। আর যদি কাগজ ছিঁড়তেই হয় তবে খাবলে খাবলে নয়, সরু করে পরতে পরতে ছিঁড়তে হবে।
* একাগ্র চিত্তে রোলের স্বাদ উপভোগ করতে হবে। তাড়াহুড়ো নয় ধীরেসুস্থে। সময় নিয়ে রোলের স্বাদ ছড়িয়ে দিতে হবে জিহ্বা থেকে মস্তিস্কে, দেহের প্রতিটি কোষে... তবেই না আপনার মানবজীবন থুড়ি বাঙালীজীবন সার্থক।
আপনার পছন্দের সেরা রোলের দোকান কোনটি ; চাইলে সবাইকে জানাতে পারেন এখানে, তবে সেটা সম্পূর্ণ ভাবে আপনার ইচ্ছাধীন।
সংগৃহীত এবং পরিমার্জিত