09/04/2026
শ্রদ্ধাঞ্জলি
জন্ম আমার কবে হয়েছিলো মনে নেই। চোখ খুলতেই মা কে কাছে পেয়েছি। আমি তখন অনেক ছোট। গুটি গুটি পা এ হাঁটতে শিখছি। বুঝতে পারি এটা একটা পাহাড়ি গ্রাম। সবুজে ভরা। পৃথিবীটা এত সুন্দর জন্ম না নিলে হয়তো বুঝতেই পারতাম না। তবে এই সুন্দর পৃথিবী তে আমাদের মতো চারপেয়ে প্রাণীরা যে অনেকতাই অবহেলার পাত্র তা কয়েকদিনের মধ্যেই বুঝতে পারলাম।মা সব সময় কাছে থাকত না। তাই ছোট ছোট পা এ দুই পা যুক্ত জীবদের দরজায় দরজায় ঘুরে বেড়াতাম যদি কেউ কিছু খেতে দেয়। ছোট বলে অনেকেই খেতে দিত কিন্তু খাওয়া হয়ে গেলেই তাড়িয়ে দিত। কয়েকদিনের মধ্যেই মা এর কাছে জানতে পারলাম যে এই দুই পা যুক্ত প্রাণীদের মানুষ বলে। আর এই মানুষ আমাদের কাছে প্রভু এর মতো।
মা এর সঙ্গে আমার অনেক মিল। লিঙ্গ ভিন্ন হলেও আমি অনেকতা আমার মা এর মতোই দেখতে। আমার বয়স তখন এক মাস হবে। পাহাড়ে সবে বর্ষা ঢুকবে ঢুকবে করছে। এদিকে আমার মনে হচ্ছিলো সবার ই তো একটা প্রভু আছে। আমার একটা হলে মন্দ হয় না। কয়েকদিন ধরে লক্ষ করছিলাম এক শহুরে বাবু এখানে এসেছে। সে পাশেই থাকে। দেখে তো দয়ালু বলেই মনে হয়। একদিন সন্ধেবেলা সাহসে ভর করে তার রান্না ঘরের সামনে গিয়ে বসলাম। দরজা খোলা ছিলো। সাহস আরেকটু বাড়লো। দরজার চৌকাঠ পেড়িয়ে বসলাম করুন মুখ করে। বাবু পিছন ঘুরে এক ঝলক আমায় দেখলেন। বেশ ভালো করে আমায় দেখলেন। তারপর আমার কাছে এসে মাথায় গলায় হাত বুলিয়ে আমায় আদর করলেন আর ছোট বাটিতে দুধ খেতে দিলেন। সেদিন আমার আনন্দ দেখে কে। সেদিন কোনো মানুষের সত্যিকারের স্নেহের স্পর্শ পেয়েছিলাম। অসুবিধে হয়নি তোমায় প্রভু হিসেবে মেনে নিতে। পরের কয়েকটা দিন তোমার ঘরের বাইরেই শুয়ে থাকতাম। রাতে মা ও এসে শুয়ে থাকত আমার পাশে।
কিন্তু ভাগ্য খুব একটা সহায় ছিলো না। সকালে ঘুমোচ্ছি। কোনো এক মানুষ খপাৎ করে গলা ধরে আমায় একটা ঝুলি তে পুরে নিলো। বুঝতে পারলাম আমায় কোথাও নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। আমি অবলা জীব। তাই ভাষায় প্রকাশ করতে পারি না। তার মধ্যে এত ছোট যে আত্মরক্ষার কৌশল ও জানা নেই। প্রায় ঘণ্টা দুই পরে কেউ আমায় ঝুলি থেকে বের করে একটা খাঁচায় পুরে দিলো আর জলে ভেজানো ভাত খেতে দিলো। তখন আমার চোখে জল। এরা কারা । সবাই তো নতুন মুখ। কোথায় আমার গ্রাম , কোথায় আমার চেনা রাস্তা, কোথায় আমার মা, কোথায় বা আমার শহুরে বাবু। কেউ কি আমার কথা একটি বার ও ভাবলো না। আসে পাশের মানুষের কথায় বুঝতে পারলাম ওরা আমায় জোর করে ধরে নিয়ে এসেছে। আজ থেকে এরাই আমার প্রভু, এটাই আমার বাড়ি। নিজের দুর্ভাগ্যের কথা ভাবতে ভাবতে অন্ধকার হয়ে এলো। হঠাৎ একটা চেনা গন্ধ নাকে এলো। আমি কি স্বপ্ন দেখছি। তাহলে আমি যেটা ভাবছি সেটা কি সত্যি। আমার ভাবনা শেষ হবার আগেই খাঁচার দরজা খুলে গেলো। সামনে দাঁড়িয়ে আছে আমার শহুরে বাবু আর তার আরেক বন্ধু নিমা। তখনও আমার চোখে জল। তবে এই জল আনন্দের। এক লাফে খাঁচার বাইরে বেরিয়ে আসতেই বাবু আমায় কোলে তুলে কত আদর করে দিলো। বাবুর ও চোখে জল ছিলো। কেউ না বুঝতে পারলেও আমি পেরেছিলাম। সেদিন বাবুর কোলে করে ঘরে ফিরেছিলাম। আমার এই ছোট্ট জীবনের সব থেকে আনন্দের দিন ছিলো সেই দিনটি। এই বাবুই আমায় ফিরিয়ে দিয়েছিলো আমার মা এর কাছে।
এইভাবে দিনগুলো ভালোই কাটছিলো। শহুরে বাবুর দয়ায় আমার খাওয়া পড়ার অভাব ছিলো না। বর্ষা কালে বাবু আমায় ঘর ও বানিয়ে দিয়েছিলো আর আমার শোয়ার বন্দোবস্ত করেছিলো । বাবু আমায় যথেষ্ট স্নেহ করতো। ঝড় বৃষ্টির রাতে জানালা খুলে মাথা বের করে দেখতো আমি ঠিক আছি কিনা। একদিন প্রচণ্ড বৃষ্টি তে আমার ঘর ভিজে যাওয়ায় বাবু নিজের ঘরে আমার ঢুকিয়ে নিয়েছিল। আমি কোনোদিন ভুলব না। আমি বরাবরই খুব শান্ত স্বভাব এর। তাই বাবুর খুব আদুরে ছিলাম। আমার স্বজাতি রা আমায় খুব ঈর্ষা করতো যখন বাবু নিজের রান্না ঘরে ঢুকিয়ে আমায় অন্যদের থেকে বেশি বেশি খাওয়াতো। বাবুর অনেক বন্ধুরা আসত। তারাও আমায় খুব আদর করতো।
একটা সমস্যা হতো। বাবু মাঝে মাঝে কোথায় একটা চলে যেতো। বাবু গ্রামের সবাইকে বলে যেতো আমার দেখাশোনা করতে। সবাই আমায় খেতে দিত কিন্তু বাবুর অভাব টা কোথায় একটা থেকেই যেতো। আমি দিনের পর দিন অপেক্ষা করে থাকতাম। কখন আবার সেই গন্ধটা পাবো। আবার ছুটে যাব বাবুর আদর খেতে।
অনেকদিন পরে বাবুকে ফিরে পাওয়ার অনুভূতিটা ঠিক বোঝাতে পারব না। হয়তো সন্ধে বেলা মন খারাপ করে শুয়ে আছি বা বসে আছি, এমন সময় বাতাস বলে দিত বাবু আসছে। আমার বাবু আসছে। সেই গন্ধ বরাবর পাগলের মতো ছুটতে থাকতাম যতক্ষণ না বাবুর দেখা পাই। মুখে বলতে পারি না কিন্তু বলতে চাইতাম "আমায় একটু কোলে নেবে গো বাবু, সেই যেমন ছোট বেলায় নিয়েছিলে "। বাবুও আমায় সেদিন খুব খুব আদর করতো, গলা জড়িয়ে, বুকে পেটে হাত বুলিয়ে। বাবুকে আমার খুব বলতে ইচ্ছে করতো "আমায় এই ভাবে ছেড়ে যেও না, এক বা দুদিন এর জন্য ঠিক আছে কিন্ত বেশি দিনের জন্য যেও না। আমি তো তোমাকে প্রভু হিসেবে মেনে নিয়েছি। আমি এক অসহায় প্রাণী, তুমি প্রদত্ত মাংসভাত এর জন্য অপেক্ষা করে থাকি। আমার মতামতের কি বা দাম থাকতে পারে, বরং ভালোবাসা যে টুকু পাওয়া যায় সেই টুকুই সম্বল করে থাকি"।
এইভাবে প্রায় একটা বছর কেটে গেছে। আমিও অনেক টা বড় হয়ে উঠেছি। শহুরে বাবুর আসা যাওয়া টা আমার কাছে অভ্যেস এ পরিণত হয়েছে। যদিও বাবুর আর আমার দুজনের প্রতি দুজনের ভালোবাসাটা এতটুকুও কমেনি। এই তো আগের মাসের শেষের দিকে সকালে বাবু আমায় পেট ভরে খাওয়ালো, তারপরে গাড়ি করে চলে গেলো। বুঝতে পেরেছি আবার অনেক দিন পরেই আসবে। কিন্তু এটা বুঝিনি যে এটাই হয়তো শেষ দেখা।
নতুন মাস শুরু হয়েছে। কয়েকদিন হলো শরীরটা সঙ্গ দিচ্ছে না। শুধু আমি না, মাও ভালো নেই। আমার স্বজাতি রাও অনেকে ভালো নেই। কি একটা অসুখ দেখা দিয়েছে। শহুরে বাবুর কথা খুব মনে হচ্ছিলো। সে থাকলে নিশ্চই কিছু করতো। পরবর্তী দুদিনের মাথায় মা কে হারালাম। শহুরে বাবুর অনুপস্থিতিতে মা ছিলো আমার একমাত্র আশ্রয়। আজ যে আমি বড় একা হয়ে গেলাম। আরও দুটো দিন কেটে গেলো। কিছু খেতে পারছি না। সারা শরীর জুড়ে অসহ্য যন্ত্রণা। পরিষ্কার বুঝতে পারলাম এই মহামারী অসুখ আমাকেও বাঁচতে দেবে না। দুর্বল শরীরটাকে কোনোমতে টেনে নিয়ে গেলাম গ্রামের শেষ প্রান্তে। সবার থেকে দূরে। আজ যে তোমায় বড় মনে পড়ছে বাবু। খুব দেখতে ইচ্ছে করছে। শেষ দেখা। তুমি হয়তো অনেক দূরে কোনো শহরে পড়ে আছো নিজের কর্মব্যস্ত জীবনে। তোমার কাছে আমি চিরকৃতজ্ঞ। তুমি আমার অন্নদাতা। তোমার ঋণ আমি পরিশোধ করতে পারব না। গ্রামে ফিরে তুমি আমায় খুঁজবে জানি, কিন্তু দেখতে পাবে না আমায়। তখন আমি তোমার থেকে অনেক দূরে। তবে দুঃখ কোরো না। ভগবানের কাছে এটুকু প্রার্থনা করব যেন পরের জন্মে তোমার কাছেই ফিরে আসি। শুধু একটাই অনুরোধ। আরেকটু যত্ন নিও আমার। ছেড়ে যেও না। সময়মতো প্রতিষেধক দিলে হয়তো আমি থেকে যেতে পারতাম তোমার কাছে ।
ঠিক আছে, এবার আমি আসি। মা অপেক্ষা করছে যে ওপারে বসে। ফিরে যাই মা এর কাছে।
আসি তাহলে। নিজের যত্ন নিও।