16/05/2026
আমাদের রূপকথা ইকো স্টে তে থাকার অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিলেন শিক্ষিকা Ajanta Saha
ওনার কলমে
গেট খুলে ভেতরে পা রাখতেই একদিক থেকে মধুমঞ্জরি আর একদিক থেকে বাগান বিলাস একগাল হেসে স্বাগত জানালো আমাকে। এভাবেই শুরু হয়েছিল গল্পটা। আমার আর রূপকথার ভালবাসাবাসির গল্প।
রূপকথা মানে রূপকথা ইকো স্টে-র কথা বলছিলাম, ঈদের ছুটিতে শহর থেকে দুদিন দূরে কাটাবো বলে পুরুলিয়াতে আসার পর যে প্রকৃতি বাসাটা হয়ে উঠেছিল আমাদের অস্থায়ী আবাস।
নানারকম গাছ-গাছালি ,দোলনা, হ্যামক খড়ের ছাউনি দিয়ে ভারী সুন্দর করে সাজানো এই ইকো স্টে তে ঢুকতেই দেয়ালের গায়ে মধুবনী আর পটচিত্র কলার সংমিশ্রণে যে বর্ণময় কারুকাজ চোখ ভরিয়ে দেয় তা এই প্রকৃতিবাসার কর্ণধার শ্রী অজয় পাল দাদার অনেক রাত জাগা পরিশ্রমের ফল।
পুরুলিয়া কে এর আগে দেখেছিলাম শীতের রুক্ষতায় অযোধ্যা পাহাড়, লহরিয়া শিব মন্দির, পাখি পাহাড়, মাঠা পাহাড় ,চড়িদা মুখোশ গ্রাম, খয়রাবেরা ড্যাম- এদের সৌন্দর্যের মাঝে। আর এবার দেখতে এসেছি তার পলাশ -কুসুম- মহুয়ার আদরে মাখামাখি নির্জনতার রূপ কুলতোর, জীবনপুর গ্রামে।
পৌঁছানোর পর অল্প বিশ্রাম আর এলাহী ব্রেকফাস্ট( যার মধ্যে ছিল ফুলকো লুচি সাদা আলুর তরকারি গরম জিলাপি ডিম সেদ্ধ আপেল কুচি, অনেক না না করলেও অজয়দা কিছুতেই সব টুকু না খাইয়ে ছাড়েননি।) সেরে টোটো নিয়ে ঘুরতে বেরিয়ে পড়লাম। সঙ্গী হলেন অজয় পাল দাদা। যেভাবে অতিথিকে নিজের বাড়ি ঘর ঘুরিয়ে দেখায় মানুষ ঠিক তেমনি যত্নেই আমাদের পুরুলিয়ার সৌন্দর্য দেখালেন দাদা। সাঁওতাল গ্রাম দেখে ডুব দিলাম সোনাঝুরির সবুজ সমুদ্রে। পায়ের নিচে শুকনো পাতা ভাঙ্গার আওয়াজ....কোথা থেকে কে জানে ভেসে আসছে চোখ গেল পাখির ডাক....ইচ্ছা করছিল সময় থেমে যাক এখানেই । কিন্তু তা তো হওয়ার নয় ।তাই কিছু মুহূর্তকে বন্দী করলাম মুঠোফোনে। এরপর স্থানীয় একটি প্রত্নতাত্ত্বিক ক্ষেত্র ঘুরে দেখলাম। দেখলাম স্বয়ম্ভু শিব মন্দির। স্থানীয় জনগণের বিশ্বাস সম্পূর্ণ মন্দিরটি নাকি এক রাতের মধ্যে মাটি থেকে উঠে এসেছিল।
পরদিন অর্থাৎ আমাদের পুরুলিয়া ভ্রমণের দ্বিতীয় দিনে আমরা জয়চন্ডী পাহা,ড় গড় পঞ্চকোট আর বরন্তি দেখে এলাম। বরন্তি তে সূর্যাস্ত দেখবার খুব ইচ্ছা ছিল কিন্তু দেখলাম বৃষ্টি ভেজা বরন্তিকে। হঠাৎ ঝড় এসেছিল সেদিন বিকালে। ইকো ষ্টেতে ফিরে দেখি বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন ঝড়ের দাপটে। অন্ধকারে ঝিঁঝির ডাক ,জোনাকি জ্বলানেভা.... দূর থেকে ভেসে আসা কীর্তনের শব্দ সে এক অদ্ভুত অনুভূতি।
পরদিন সকালে আবার টোটো নিয়ে অজয়দার দিক নির্দেশনায় দেখে নিলাম বংশী বাবার আশ্রম। তারপর দারকেশ্বর নদীর বুকে পায়ের পাতা ডোবার জল পেরিয়ে অন্য পাড়ে গিয়ে উঠলাম, আবার ফিরে এলাম। এভাবে নদীর বুকে হাটা আমার এই প্রথম। কি যে ভালো লেগেছে নদীর সাথেএই ক্ষণিকের
মিতালী....সব টুকু বলে বোঝাতে পারবো না। ফেরার পথে দেখলাম যোগমায়া সরোবর রঞ্জন ডি ড্যাম এখানে বোটিং করার ইচ্ছা থাকলেও সময় ভাবে সেটা হলো না।
এদিন বিকালে একটা পাহাড় দেখলাম যার নাম ইকো পাহাড়। জোরে কথা বললে প্রতিধ্বনি হচ্ছে। পুপে তো খুব মজা পেল এই পাহাড় দেখে। এরপর আরেকটি ছোট টিলায় উঠলাম আমরা। পুপে খুব ভয় পাচ্ছিল, কেঁদেও ফেলেছিল। আমার কিন্তু খুব ভালো লাগলো টিলা থেকে সূর্যাস্ত দেখতে ।
এদিন রাতেই ছিল আমাদের বাড়ি ফেরার ট্রেন। প্রকৃতির কোলে দুদিন কাটিয়ে আবার শহরের ক্যাকোফনির মধ্যে ফিরে আসা। বিদায় উপহার হিসেবে অজয় পাল দাদা আমাদের হাতে তুলে দিলেন রূপকথার পরিধির মধ্যে জন্মানো নানা সবজি । ফেরার সময় দাঁড়িয়ে ছিলেন দাদা। আমাকে বললেন যখন ইচ্ছা হবে দাদার বাড়ি থেকে ঘুরে যেও। সত্যি। উনি যে নিজের দাদা নন সেটা যেন ভুলে গিয়েছিলাম ওনার অদ্ভুত আন্তরিকতা আর আতিথেয়তায় ।খুব ইচ্ছে আছে শরতের কাশফুল ফোটার সময় আরেকবার রূপকথা কে দেখব। দেখা যাক হয় কিনা । পুরুলিয়াকে একটু অন্যরূপে দেখতে যারা আগ্রহী তারা ঘুরে আসতে পারে এই রূপকথার থেকে। আমার দৃঢ় বিশ্বাস তারা ঠকবে না।
এখন গ্রীষ্মের প্রচণ্ড দাবদাহ আর আসন্ন ভোটের টেনশন যখন মনকে চেপে ধরেছে তখন নিজেকে একটু সতেজ করতে পুরুলিয়া ভ্রমনের আনন্দ মুহূর্তগুলোই ফিরে দেখছি বারবার।