10/08/2026
।। শ্রাবণী শিবতর্পণ।।
(শিব গাত্রে পদ থেকে কেউ বিতর্ক করবেন না, চাইলে পুরোটা পড়বেন অথবা এড়িয়ে যাবেন। )
শিবতর্পণ অবশ্য কর্তব্য, তাই আসুন একটা বিশ্বাসের গাথা ভাগ করে নিই।
সে বহুকাল আগের কথা, জনকারাধ্য কপর্দ্দীনাথকে তুষ্ট করে পশুপাত অস্ত্র সাথে পুনরায় শিব ভক্ত হয়ে জন্মানোর আশীর্বাদ পেলেন অর্জুন।
কলিতে অর্জুন জন্মালেন ব্যাধ থিন্নারু হয়ে, বিধাতার নিয়মে পূর্বস্মৃতি লুপ্ত। অরণ্যাচারী ব্যাধ জাতে শুদ্র, তাই সে সর্বসম্মুখে আসার সাহস পায় না। একা বনে বনে ঘুরে বেড়ায়। যেদিন যা পায় তাই দিয়ে গ্রাসোচ্ছাদন করে। ঝর্ণায় মুখ দিয়ে জল খায়। গাছের শাখে রাত কাটায়।
এই ভাবেই বনে ঘুরতে ঘুরতে একদিন এক পরিত্যক্ত মন্দিরে শিবলিঙ্গের দর্শন পায় থিন্নারু। নিদারুণ অবস্থায় পড়ে আছে লিঙ্গটি, গাত্র মার্জনা প্রয়োজন। কিন্তু তার তো পাত্র নেই! অগত্যা নিকটবর্তী স্বর্ণমুখী নদী হতে মুখে করে করে জল এনে শিবলিঙ্গের গাত্র মার্জনা করে থিন্নারু। সেদিন তার শিকার ছিল বন্য বরাহ, অগত্যা সেই মাংসেরই ভোগ দেয় কানাপ্পা! এতকিছু স্বত্তেও সেই তিনি কিন্তু ক্রুদ্ধ হননি। তিনি যে সদাশিব– দেব, দানব, মানুষ, প্রেত সবার দেবতা। ভক্তের ভক্তিতে তুষ্ট। এসবের মধ্যে থেকে কেবল কান্নাপ্পার ভক্তিটুকু আঁজলা করে তুলে নিয়েছিলেন।
একদিন প্রবল ভূমিকম্প এল। চতুর্দিকে মানুষ পশু প্রচন্ড ত্রাসে পলায়ন প্রমুখ। নগরে নগরে মন্দির দেউল ফাঁকা হয়ে গেছে। সবাই খোলা প্রাঙ্গণে জমা হয়েছে। কিন্তু থিন্নারু তার সেই শিবলিঙ্গটি জড়িয়ে মন্দিরে বসে রইল। তার একাকী জীবনে এই লিঙ্গনাথ ছাড়া যে আর কেউ নেই। তিনিই তার একমাত্র আপন। পাথরের চাঙড় খসে পড়ে, কান্নাপ্পা নিজের ক্ষীণ বপু দিয়ে আরও বেড় দিয়ে তার শিবকে। আঘাত তার পিঠে আসুক কিন্তু এই মূর্তিতে সে আঁচড় পড়তে দেবে না।
ঈশ্বরও ভক্তের এই ভক্তিতে কেঁদে ফেললেন। শিবমূর্তির চক্ষুপট দিয়ে বেরিয়ে এল অশ্রু ও রক্ত। থিন্নারু ভাবলেন মূর্তির চক্ষু আহত হয়েছে। বান দিয়ে আপন ডান চক্ষু উপড়ে বসিয়ে দিলেন সেথায়!
কিন্তু অপর চোখ! সেটা উপড়ে নিলে মূর্তিতে স্থাপন করবেন কীভাবে! হাতও বন্ধ, চক্ষু উপড়াতে হবে...
অগত্যা নিজের পদ দিয়ে নির্ধারণ করে নিলেন লিঙ্গের চক্ষু অবস্থান, দুই হাতে উপড়াতে গেলেন অবশিষ্ট চোখ....
ত্রিলোচন এবার আর স্থির থাকতে পারলেন না। তিনি ত্রিলোচন তবুও এই ব্যাধ সরল বিশ্বাসে তার সর্বস্ব দিতে চেয়েছে! এই সারল্য, এই ত্যাগ যদি শিবত্ব না হয় তবে শিবত্ব কী?
ব্যাধ, অচ্ছুৎ থিন্নারু হলেন শিবসাধক কান্নাপ্পা নায়ানার। কন্ন অর্থ চোখ, আপ্পা অর্থ বাবা। এখানে পরমেশ্বর শিব। যে মানুষটা ছিলেন তীব্র নাস্তিক তিনি স্ত্রীর ভক্তি অর্ধ অঙ্গ হয়ে হয়ে উঠলেন পরম শিব ভক্ত। থিন্নারু হলেন অর্জুনের পুনর্জন্ম। ৬৩ নায়ানারের দশম নায়ানার। অন্ধ্ররাজ্যের শ্রীকালহস্তেশ্বরের সেই মন্দির আজও বর্তমান। সেই আদি অর্থাৎ স্বয়ম উদ্ভুত লিঙ্গম্ আজও খুঁজে চলেন তার ভক্তদের। ভক্ত ও ভগবান কেউই কাউকে ছেড়ে যেতে চান না যে।
~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~
তাহলে, দেবতা মানে প্রস্তর খন্ড বা মূর্তি নয় বরং সেই খোলসের অভ্যন্তরে লুকিয়ে থাকা বিশ্বাস, ভক্তি আর ভালোবাসা৷ নিরাকার সত্যের সাকার রূপে, বিমূর্ত ভাবনা হল মূর্তি। আর হৃদয়ে দুইয়ের অনুনাদই হল ঈশ্বর প্রাপ্তি। তাই ধর্মের অন্ধত্ব নয় বরং ভক্তি, বিশ্বাস , প্রেম আর সম্ভ্রম থাক।
।। ওঁ নম শিবায়ঃ।।